যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীদের ওপর গোপন নজরদারির চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও লিবার্টি ইনভেস্টিগেটসের একটি যৌথ অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যের প্রথম সারির ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রাক্তন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত একটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সংস্থাকে ভাড়া করে ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ওপর গোপনে নজরদারি চালিয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নজরদারির বিস্তারিত
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হোরাস সিকিউরিটি কনসালটেন্সি লিমিটেড’ নামক গোয়েন্দা সংস্থাটিকে ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় ৪ লক্ষ ৪০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৬ কোটি টাকা) পরিশোধ করেছে। এই সংস্থার নেতৃত্বে রয়েছেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোনাথন হোয়াইটলি এবং কর্নেল টিম কলিন্স।
অভিযোগ উঠেছে, সংস্থাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে যারা গাজায় ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে আন্দোলন বা বিক্ষোভের ডাক দিচ্ছিলেন, তাদেরই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নজরদারির শিকার ব্যক্তিদের তালিকা
এই গোপন নজরদারির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির একজন ফিলিস্তিনি অতিথি বক্তা এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের একজন পিএইচডি গবেষক। অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জুনে এলএসই-এর নিরাপত্তা দল হোরাসের কাছ থেকে নিয়মিত ‘ক্যাম্পাস আপডেট’ ক্রয় করত, যার মধ্যে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পোস্টগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদ রাবাব ইব্রাহিম আব্দুলহাদির ওপর একটি গোপন ‘সন্ত্রাসবাদ ঝুঁকি মূল্যায়ন’ বা থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট করার জন্য হোরাসকে দায়িত্ব দিয়েছিল ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি। ওই শিক্ষাবিদ এই কার্যক্রমকে ‘দোষী সাব্যস্ত করার আগেই তদন্ত’ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
এই নজরদারির তালিকায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন-এর মতো নামিদামি প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তারা কেবল ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আগে থেকে আঁচ করতে এই ধরণের সেবা নিয়েছে। তারা কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য পাচার বা বেআইনি কাজ করেনি বলে জোর দাবি করেছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূত জিনা রোমেরো এই ঘটনাকে ‘গভীর আইনি উদ্বেগ’ হিসেবে দেখছেন। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের তথ্যের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এমন নজরদারি তাদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রতিবাদ ও আন্দোলন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ইউনিয়ন ‘ইউসিইউ’ এই ঘটনাকে লজ্জাজনক বলে আখ্যায়িত করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল এভাবে নিজ শিক্ষার্থীদের পেছনে গোয়েন্দাগিরিতে ব্যয় করার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এই ঘটনা শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন।



