শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির করাল গ্রাস: নেপালের সংস্কার ও বাংলাদেশের সংকট
শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির করাল গ্রাস: নেপাল ও বাংলাদেশ

শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির করাল গ্রাস: নেপালের সংস্কার ও বাংলাদেশের সংকট

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতির গুরুত্ব যেন পাঠ্যপুস্তকের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভগ্নদশা সমাজকে বিচলিত করলেও কর্তৃপক্ষ বরাবরই উদাসীন ভূমিকা পালন করে চলেছে। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি না থাকলে গণতান্ত্রিক বিকাশ লাভ হয় না, এমন অজুহাত তুলে যুগের পর যুগ এ দেশে ছাত্ররাজনীতি প্রভাব বিস্তার করে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে একচিমটি পড়াশোনার সঙ্গে একমুঠো রাজনীতির মিশেলে যে সনদ আমাদের সেবন করতে দেওয়া হচ্ছে, তা বিশ্ববাজারে দুর্বলতার দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করছে।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি ও বাস্তবতা

ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি বন্ধের জন্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় থেকেই আমরা পত্রপত্রিকায় দাবি জানিয়ে আসছি। দলীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে শিক্ষার্থীরা যখন জিম্মি, তখন ছাত্ররাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগের ভয়াবহ নির্যাতনে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর যখন সেখানে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ থেকেছে, তখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজনীতির এই ঘানি টেনেই চলেছেন।

ফলে চব্বিশের জুলাইয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে আশার প্রদীপ জ্বলেছিল, সেই প্রদীপ জ্বালাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও কয়েক দফা প্রথম আলোতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিষয়ে লিখেছি। তবে ওই সরকার দুই দফায় শিক্ষা উপদেষ্টা পরিবর্তন করলেও ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি বন্ধের ন্যূনতম আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি যে ছাত্রপ্রতিনিধিরা অরাজনৈতিক সংগঠন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছেন, তাঁদের মুখ থেকেও একবারের জন্য বের হয়নি যে শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতি বন্ধ করা প্রয়োজন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নেপালের সংস্কার: একটি নতুন দৃষ্টান্ত

অথচ প্রায় একই সময়ে গণ-অভ্যুত্থান হওয়া আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালে আন্দোলনকারীদের দল রাষ্ট্রক্ষমতার আস্বাদ পেয়েই যে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো। শপথ নেওয়ার পরপরই দেশটির নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতা বালেন্দ্র শাহ যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, তা শুধু নেপাল নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

৩৫ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রনেতা আমাদের মতো কোনো সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে শোরগোল করেননি কিংবা মাসের পর মাস ঐকমত্য ও কমিশনের সভা করেননি। ক্ষমতায় গিয়ে দেশের পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়ামক, সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব তিনি দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শুরু করে দিয়েছেন। কথার ফুলঝুরি না ছুটিয়ে গত ২৮ মার্চ দেশটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দলীয় ছাত্রসংগঠন বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য সব ধরনের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের দ্বিচারিতা ও ভবিষ্যৎ

নেপালের তরুণেরা সে দেশের পুরোনো কাঠামোয় আঘাত করতে পারলেও আমাদের তরুণেরা পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেই নিজেদের সঁপে দিয়েছেন। বিভাজনের খেলায় মত্ত থেকে কেবল পরিবর্তনের বুলি আওড়ে যাচ্ছেন। এই দ্বিচারিতার কারণে তরুণদের বিপুল আত্মত্যাগ ও রক্তদানকে নিষ্ফলতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন খোদ তরুণেরাই। শুধু শিক্ষাঙ্গন নয়, প্রশাসনকেও অরাজনৈতিক করার উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল সরকার। সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ এবং দলীয় ট্রেড ইউনিয়ন বিলুপ্তির পরিকল্পনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।

বালেন্দ্র শাহর নেওয়া নেপালের এ সিদ্ধান্ত আমাদের বিবেকের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সেটি হলো, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা আদৌ আগের মতো আছে কি? নাকি এটি এখন শিক্ষার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি একসময় নেতৃত্বের বিকাশ, গণতান্ত্রিক চর্চা ও সামাজিক সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এই ছাত্ররাজনীতি ক্রমে দলীয় স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

উপসংহার: গুণগত শিক্ষার পথে অগ্রসর হওয়া

আমাদের মনে রাখতে হবে, গুণগত শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো জ্ঞানচর্চা, চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক বিকাশ। আর এই অনুষঙ্গগুলো যখন ব্যাহত হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা সঠিক পথে নেই। আমাদের উচ্চশিক্ষাকে লাইনচ্যুত করেছে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি। আমরা যদি সত্যিই বিশ্বায়নে নিজেদের তৈরি করতে চাই, তাহলে শাসকগোষ্ঠীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শিক্ষার গুণগত বিকাশে অবশ্যই ঐকমত্যে আসতে হবে। আর সেই ঐকমত্যের প্রধান শর্ত হবে দলীয় রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন। নেপালের সংস্কার শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যা বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে।