সম্প্রতি দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য প্রত্যাহার করলেও বিতর্ক থেমে থাকেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন টকশো, পত্রিকার কলাম এবং শিক্ষাঙ্গনের আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে, নাকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে?
সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ
প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও গভীর বিশ্লেষণে বোঝা যায়, এটি একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে দুভাগে ভাগ করে একটিকে বড় আর অন্যটিকে ছোট প্রমাণের চেষ্টা জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। শিক্ষা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র নয়; বরং এটি একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এর ঐতিহ্য, ইতিহাস ও অবদান সম্পর্কে সচেতন। একইসঙ্গে বিশ্বাস করি, দেশের অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গত দুই দশকে শিক্ষার মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাই পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন না করে উভয় ধারার প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের কেন্দ্র। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভূমিকা ইতিহাসের অংশ। তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কম গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর উচ্চশিক্ষার চাহিদা এত বেড়েছে যে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তা পূরণ করতে পারেনি; এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
বর্তমানে দেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। অনেক পরিবার সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, দেশেই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি নয়, বরং বেসরকারি বা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। উদাহরণস্বরূপ হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি, ইয়েল, প্রিন্সটন, কলাম্বিয়া, ডিউক, নর্থওয়েস্টার্ন, কর্নেল, শিকাগো, ক্যালটেক, জনস হপকিন্স, কার্নেগি মেলন ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখযোগ্য। এরা নিজ দেশ ও বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
আবার বিশ্বের বহু বিখ্যাত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে, যেমন অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, ইউসি বার্কলে, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর। অর্থাৎ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হতে সরকারি বা বেসরকারি হওয়া মুখ্য নয়; মুখ্য হলো শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা।
প্রকৃত প্রশ্ন
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে আলোচনায় আমরা মূল প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাই। আমরা জানতে চাই কে বড়, কে ছোট; কিন্তু জানতে চাই না কেন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে আছি। কেন গবেষণায় বিনিয়োগ এত কম? কেন প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষায় চলে যাচ্ছে?
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় নয়, বরং গবেষণাগারে। মর্যাদা নির্ধারিত হয় ক্যাম্পাসের আয়তন দিয়ে নয়, জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা দিয়ে। কতজন নোবেল বিজয়ী তৈরি করেছে, কত আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশ করেছে, কত উদ্ভাবন করেছে এবং মানবসভ্যতার উন্নয়নে কী অবদান রেখেছে—এসবই প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে।
পরিপূরক ধারা
বাংলাদেশের বাস্তবতায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক শিক্ষা, আইন, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, দর্শন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মৌলিক বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসায় প্রশাসন, কম্পিউটার বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্থাপত্য ও কর্মমুখী শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেয়। দুটি ধারা পরস্পরের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক।
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যেমন দক্ষ প্রকৌশলী প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষ অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, আইনজ্ঞ ও গবেষক। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নয়ন বহুমাত্রিক; তাই উচ্চশিক্ষাকেও বহুমাত্রিক হতে হবে।
উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা
আজকের বিশ্বে উন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের মূল ভিত্তি গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেয় না; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এবং শিল্পখাতকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশেও আমাদের সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কে সময় নষ্ট না করে ভাবতে হবে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের করা যায়। কীভাবে গবেষণার বাজেট বাড়ানো যায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যায়, শিক্ষকদের গবেষণার পরিবেশ উন্নত করা যায় এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকশিত করা যায়।
উপসংহার
শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই সত্য—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য বাংলাদেশের সাফল্য, আবার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যও বাংলাদেশের সাফল্য। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না; সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলেই জাতির উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার পরিচয় বহন করে।
সুতরাং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিভেদ নয়, সহযোগিতা; প্রতিযোগিতা নয়, উৎকর্ষতা; শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নয়, বিশ্বমান অর্জনের সংগ্রাম। সেই দিনই প্রকৃত অর্থে আমরা সফল হব, যেদিন বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাতারে দৃঢ়ভাবে স্থান করে নিতে পারবে। আর সেই অর্জন হবে সমগ্র বাংলাদেশের অর্জন, কোনো একক বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়।



