গতানুগতিক শিক্ষা নয়, প্রয়োজন বিশ্বমানের দক্ষ মানবসম্পদ
গতানুগতিক শিক্ষা নয়, প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, এই মেরুদণ্ড কি শামুকের মতো নরম নাকি সেগুন বৃক্ষের মতো দৃঢ়? আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন মেরুদণ্ড চাই এবং তা গড়ে তোলার উপায় কী? শিক্ষাবিদরা নিশ্চয়ই এ বিষয়ে চিন্তা করেন। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনটি জরুরি বিষয় তুলে ধরছি।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ইতিহাসে জ্ঞান অর্জন ছিল কঠিন সাধনা। শিক্ষার্থীদের মাইল পথ পাড়ি দিয়ে গুরুর সান্নিধ্যে যেতে হতো। পরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। লাইব্রেরির বইয়ে ডুবে থাকার যুগ প্রায় ১০০ বছর চলেছে। এখন আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করছি। যেকোনো স্থান থেকে মহাবিশ্বের জ্ঞান হাতের মুঠোয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি এই প্রক্রিয়াকে এতটাই গতিশীল করেছে যে, বছরের পর বছর লেগে যাওয়া জ্ঞান এখন কয়েক দিনে আয়ত্ত করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো, জ্ঞান বিতরণের মাধ্যম হিসেবে প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলো কি প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখবে? নাকি শিক্ষাদানের সনাতন পদ্ধতি আমূল পুনর্গঠনের সময় এখনই?

সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতার আকাল

সুন্দর জীবনের জন্য অক্সিজেনের মতো প্রয়োজন সামাজিক দক্ষতা। একসময় আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ, সম্পর্ক রক্ষা, সংকট ব্যবস্থাপনা মানুষ পরিবার ও সমাজ থেকে শিখে নিত। এখন নগর জীবন ও একক পরিবারের চার দেওয়ালে শিশুরা একা হয়ে বড় হচ্ছে। তাদের মধ্যে সামাজিক ও আবেগীয় গুণগুলো স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে কীভাবে আবেগীয় ও সামাজিক দক্ষতা মজবুত করার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা ভাবার সময় এসেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জিপিএ-৫ বনাম প্রকৃত দক্ষতা

আমরা সন্তানদের থেকে কী চাই? জিপিএ-৫ ও সর্বোচ্চ ডিগ্রির সার্টিফিকেট নিয়ে বেকারত্বের বাজারে ঘুরে বেড়ানো? নাকি নির্দিষ্ট পেশায় নিজেকে এমন দক্ষ করে তোলা, যাতে বিশ্বমঞ্চে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারে? যদি চাই সন্তানেরা সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতা দিয়ে জগত জয় করুক, তাহলে শৈশব থেকেই তাদের মনে সেই স্বপ্নের বীজ বুনতে হবে।

পোলগার পরিবারের উদাহরণ

১৯৭৫ সালে হাঙ্গেরির শিক্ষক লাজলো পোলগার গবেষণা শুরু করেন শিশুদের অন্তরে স্বপ্নের বীজ বপন পদ্ধতি নিয়ে। তিনি বেছে নেন নিজের তিন কন্যা সুসান, সোফিয়া ও জুডিকে। বাবা-মা মিলে শুরু করেন তাদের জীবনে স্বপ্নের বীজ বপন ও পরিচর্যার কাজ। পোলগার দাবা খেলায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি মেয়েদের দাবার দুনিয়ায় বিস্ময় হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। পুরো বাড়ি দাবার জাদুকরী রাজ্যে রূপান্তরিত হয়। দেয়ালে ঝুলানো হয় বিশ্বসেরা দাবাড়ুদের ছবি, মেডেল, অর্জনের গল্প। পরিবেশ এমন করা হয় যে, মেয়েদের চিন্তা, আনন্দ, আড্ডার মূল বিষয় হয়ে ওঠে দাবা। বাবা-মা জানতেন, মানসিক অভ্যাসই জীবনসত্তা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তারা কন্যাদের এমনভাবে দাবার জগতে অভ্যস্ত করান যে, শিশুরা খেলাটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে।

এক রাতে বাবা সোফিয়াকে বিছানায় না পেয়ে বাথরুমে দেখেন, ছোট্ট সোফিয়া একাকী মেঝেতে দাবার ঘুঁটি নিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন। বাবা বলেন, 'সোফিয়া, অনেক রাত হয়েছে, ওদের রেখে ঘুমাতে এসো।' সোফিয়া উত্তর দেয়, 'বাবা, আমি ওদের ছেড়ে আসতে চাইলেও ওরা যে আমাকে ছাড়ছে না!'

ফল কী হয়েছিল? বড় মেয়ে সুসান ৪ বছর বয়সে দাবা শুরু করে, ৬ মাসের মাথায় প্রাপ্তবয়স্ক খেলোয়াড়দের হারাতে শুরু করে। সোফিয়া শুরু করে আড়াই বছর বয়সে, ১৪ বছর বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ছোট জুডি ৫ বছর বয়সে বাবাকে ছাড়িয়ে যায়, ১২ বছর বয়সে বিশ্বের সেরা ১০০ দাবাড়ুর তালিকায় নাম লেখায়, ১৫ বছর ৪ মাস বয়সে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হয়। এই রেকর্ড ২৭ বছর অটুট ছিল।

প্রশ্ন, আমরা কি এমন পদ্ধতি অনুসরণ করছি, যা দিয়ে শৈশবেই শিশুদের অন্তরে মহান জীবনলক্ষ্য জুড়ে দেওয়া যায় এবং সেই লক্ষ্যের প্রতি শ্রম ও সময় নিবেদন করা যায়?

বাস্তব উদাহরণ

এক বন্ধুর ছেলে পড়াশোনায় মেধাবী, সব বিষয়ে প্রায় একশোতে একশো পায়। কিন্তু সকালে বইয়ের ব্যাগের নির্মম ওজনে শিশুটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। শৈশবের চঞ্চলতা ব্যাগের নিচে চাপা পড়ে গেছে। স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করে খেলার সুযোগও নেই। আমার ভাগ্নী দশম শ্রেণীর ছাত্রী, তার লক্ষ্য সফল ব্যবসায়ী হওয়া। অথচ সে মুখস্থ করছে মানবদেহের হৃৎপিণ্ডের ভাল্বের কার্যপদ্ধতি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার জীবনের লক্ষ্যের সাথে সংযোগ কতটুকু? যদি এই শ্রম ও সময় নিজের লক্ষ্যের পেছনে ব্যয় হতো, তাহলে তা আরও অর্থবহ হতো।

উচ্চশিক্ষায় তীব্র প্রতিযোগিতায় সিংহভাগ শিক্ষার্থী নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। ফলে জীবনের সোনালী ৫-৭ বছর কাটে এমন বিষয় পড়ে, যার সাথে মনের কোনো সংযোগ নেই। মনের টান না থাকায় আন্তরিকতা ও সৃজনশীলতা আসে না। শিক্ষা শেষে কর্মক্ষেত্রেও পছন্দের কাজের অভাব। ফলে ৬৫-৭০ বছর বয়সে পৌঁছে তীব্র অপূর্ণতা ও মনস্তাত্ত্বিক হাহাকার নিয়ে বিদায় নিতে হয়।

গভীরভাবে ভেবে দেখুন, আমরা যদি শৈশবেই প্রতিটি শিশুর জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে দিতে পারি এবং সেই লক্ষ্য ছোঁয়ার সুস্থ পরিবেশ গড়ে দিই, তাহলে কেমন হবে এই প্রজন্ম! এই জাতি কোন উচ্চতায় আসীন হবে! আর সেই মানুষগুলো তাদের কাজ ও জীবন কতটা উপভোগ করবে!