সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ৯০ বছরে পৌঁছে জাতির কিংবদন্তি শিক্ষক
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ৯০ বছরে জাতির কিংবদন্তি শিক্ষক

বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ২৩ জুন ২০২৬ সালে ৯০ বছর পূর্ণ করেছেন। ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন তাঁর জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক তিনি জাতীয় অধ্যাপক না হয়েও জাতির কিংবদন্তি শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।

শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠা ও একাগ্রতা

তাঁর সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে—তিনি কোনোদিন কোনো ক্লাসে গরহাজির ছিলেন না। এমনকি তাঁর স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরী যেদিন মারা যান, সেদিনও তিনি ক্লাসে গিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, আজ তিনি পড়াতে পারবেন না। এই ঘটনা সত্য হোক বা কিংবদন্তি, শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা ও একাগ্রতা প্রবাদপ্রতিম। জীবনযাপনে আশ্চর্য পরিমিতি ও শৃঙ্খলা তাঁকে ৯০ বছরেও সুঠাম ও ঋজু রেখেছে। তাঁর স্বাস্থ্য ভালো, স্মৃতি প্রখর ও চিন্তা স্পষ্ট।

ছাত্রজীবন ও সাহিত্যচর্চা

ছাত্রজীবনে তাঁর লেখা ‘সময় বহিয়া যায়’ কলামের জন্য অপেক্ষা করতেন পাঠকেরা। ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য, সমাজ—বিচিত্র বিষয়ে তিনি লিখেছেন। তাঁর বই ‘আমার পিতার মুখ’ ও ‘শেক্সপীয়রের মেয়েরা’ পাঠকমহলে ব্যাপক প্রশংসিত। কৈশোরেই তিনি হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন, যাতে বিখ্যাত মানুষদের লেখাও প্রকাশিত হতো। আজিমপুরে এসে ছেলেমেয়েরা মিলে দেয়ালপত্রিকা করতেন, বাঁশে টাঙানো পত্রিকার নাম দিয়েছিলেন ‘বাঁশ-পত্রিকা’। তিনি নিজে হতে চেয়েছিলেন গল্পকার ও ঔপন্যাসিক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধ্যাপনা তাঁকে প্রাবন্ধিক করে তুলল। তিনি নিজেই বলেন, ‘অধ্যাপকের কাজ বিশ্লেষণ করা, আর কথাসাহিত্যিকের কাজ সংশ্লেষণ করা। দুটি কাজ ভিন্ন।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ

উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে গিয়ে তিনি সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হন। সারা জীবন সেই আদর্শ থেকে সরে আসেননি। পুঁজিবাদী বৈষম্য ও অন্যায়ের সমালোচনা তিনি করে গেছেন নিরন্তর। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের মুক্তি সমষ্টির মধ্যেই নিহিত। ১৯৭১ সালে তাঁর নামও হত্যাকারীদের তালিকায় ছিল। জগন্নাথ হলের বিভীষিকাময় দিনগুলো তিনি দেখেছেন। অনেকেই শহীদ হয়েছেন, তিনি বেঁচে গেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি দেখেছেন সমষ্টির স্বপ্ন ধীরে ধীরে ব্যক্তিস্বার্থের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবন ও বর্তমান

১৯৮৯ সালে স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরী মারা যান। ‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’ নামে তিনি একটি অসাধারণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তারপর দুই মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা আছে বলেই নিজেকে একা মনে হয় না।’ তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে তিনি আবার স্বপ্নের কথায় ফিরে আসেন। বলেন, ‘এই গ্রহটাকে বাঁচাতে হবে। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না। পৃথিবীকে সুন্দর করবে সেই মানুষেরা, যারা একই সঙ্গে হৃদয়বান এবং বুদ্ধিমান।’

৯০ বছর বয়সে পৌঁছে একজন মানুষের এই বিশ্বাস ধরে রাখা সহজ নয়। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এখনো সেই বিশ্বাস ধারণ করেন। সম্ভবত এ কারণেই তিনি আমাদের কাছে শুধু একজন অধ্যাপক নন, শুধু একজন প্রাবন্ধিকও নন। তিনি আমাদের চিন্তার জগতের একজন শিক্ষক। আর আমরা, তাঁর বহু পাঠকের মতো, এখনো তাঁর কাছ থেকে এই কথাটিই শিখে চলেছি—স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না।