স্মৃতির টাইম মেশিনে তিতাস নদীর যাত্রা: শৈশবের হারানো দিন
স্মৃতির টাইম মেশিনে তিতাস নদীর যাত্রা

একটি ছোট ছেলে খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘আব্বা, টাইম মেশিনে কি ডাইনোসরদের সময় যাওয়া যাবে?’ যন্ত্রপাতি ও বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ। নাট-বল্টু, স্ক্রু ড্রাইভার, ব্যাটারি, চুম্বক পেলেই তার আর কিছুই চাই না। পুঁচকে শিশুটি কোনো এক বন্ধুর কাছ থেকে টাইম মেশিনের কেরামতি জানতে পেরেছে। আমি তাকে বললাম, ‘এখনো এ রকম কিছুই মানুষ তৈরি করতে পারেনি, সবকিছুই কল্পনা।’ বাচ্চাটি নিরাশ হয়ে পৈরতলা রেলক্রসিংয়ে সিএনজি বেবিট্যাক্সির দরজা দিয়ে জয়ন্তিকা ট্রেনটিকে ক্রস করতে দেখল। আমরা সদলবলে গ্রামের বাড়ি জালশুকা যাচ্ছি বেবিট্যাক্সিতে। ১৫ থেকে ২০ বছর আগে যান্ত্রিক বাহনে সড়কপথে এটা ছিল অকল্পনীয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে জালশুকায় পৌঁছাতে ৩–৪ বা কোনো কোনো সময় পাঁচ ঘণ্টাও লেগে যেত।

তিতাস নদীর দেখা

মহানগর এক্সপ্রেসের চানাচুরওয়ালার টিনের কৌটার চানাচুর মিক্সচারের মতো ঝাঁকুনি খেতে খেতে পৈরতলা থেকে গোকর্ণঘাট এলাম। বাঁ দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম তিতাস নদীকে। মনটা হু হু করে উঠল। এর ওপর একটা ব্রিজ হয়েছে আমিনপুর থেকে ওই পারে রসুলপুর পর্যন্ত। বেবিওয়ালাকে গোকর্ণ ঘাটের দিকে যেতে বললে সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এহন তো লঞ্চোর দরখার নাই, ব্যাটারি গাড়িতেই নবীনগরের সিতারামপুর পর্যন্ত যাওয়া যা।’ যতই ঘোঁতঘাঁত করুক অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ঢেঁকি গিলে ঘাটের কাছে নিয়ে এল। প্রায় মরা তিতাস নদীটার দিকে উত্তর-দক্ষিণে তাকিয়ে ছোট বেলায় ফিরে গেলাম।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এটাই অদ্বৈত মল্লবর্মণের সেই তিতাস। আমরা দুই ভাই লঞ্চঘাটের জেটিতে আম্মাসহ অপেক্ষা করছি। উত্তর দিক থেকে নবীনগরের লঞ্চ এসে পৌঁছালে ১১টায় যাব। আমাদের সারথি রফিক ভাই। লঞ্চঘাটের পন্টুন থেকে একদৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকালে বালুময় পানির তীব্র স্রোতের টান দেখা যায়, দেখা যায় ছোট ছোট মাছ। হাত থেকে মুড়ি পানিতে ফেললে মাছগুলো ঠুকরে ঠুকরে মুড়ি খেতে চলে আসে। নদীর ওই পাড়ে রসুলপুর গ্রামের সামনে সব সময় দেখা যায় কচুরিপানা বাঁশ দিয়ে প্রটেকশন দিয়ে রেখেছে। রফিক ভাইকে বললে জানালেন, নদীর ঢেউয়ের (আফাল) ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য এ ব্যবস্থা। বাঁ দিকে তাকালে দক্ষিণ দিকের নদীর বেঁকে যাওয়া অংশটুকুর মাথায় একটি ইটের ভাটা দেখা যাচ্ছে। আর কিছুটা কাছেই দেখা যাচ্ছে বিরাট একটি মঠ। নাকে তীব্র মাদকাময় গন্ধ ঝাপটা মারলে উত্তর দিকে নদীতীরে কয়েকটা উল্টানো নৌকায় কারিগরদের আলকাতরা মাখাতে দেখতে পেলাম। জেলেরা রোদে জাল শুকাতে দিয়েছে। নিস্তরঙ্গ একটা পরিবেশ। এর মাঝে গ্রাম্যটানে নারীকণ্ঠে, ‘আলো বিলা হাবলাইয়া আ’ বলে হাঁক-চিৎকার। বেশ পেছনে কোমরের কাইতনে ঝুনঝুনির আওয়াজ তুলে ছোট্ট বাচ্চাটি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে। ওরা গোসল করতে আসছে নদীর পাড়ে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লঞ্চযাত্রা ও শুশুক দেখা

লঞ্চের সাইরেনের শব্দের পরপরই দেখতে পেলাম সাদা লঞ্চটিকে। হঠাৎ করেই অনেক মানুষের কলকাকলিতে ভরে উঠল পন্টুন। কাঠের পাটাতন দিয়ে আমরা লাফ দিয়ে লঞ্চে উঠলেও আম্মা সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে কেবিনে উঠলেন। আম্মার কষ্টটা বুঝতাম না। তীব্র উত্তেজনা—আবার দাদা-দাদিকে দেখতে পাব।

একতারা হাতে একজন গ্রাম্য গায়ক উঠলেন। গান গেয়ে সাহায্য চাচ্ছেন। লঞ্চের ঝমঝম শব্দ, ঝিরঝির বাতাস আর আশেপাশের খেতের শর্ষের তীব্র গন্ধের সঙ্গে গায়কের টুনটুন শব্দের একতারা বাজানো গান অন্য রকম একটা আবহ তৈরি করেছে। এর মধ্যেই একজন মুরব্বি বললেন, ‘অ্যাই বাবু, তোমরা কই যাইবা?’ সতর্ক দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকিয়ে ইমন বলল, ‘ওই দিকে যাব।’ আঙুল দিয়ে উত্তর দিকটা দেখায়। খুব দ্রুত আমরা স্থান ত্যাগ করি। আম্মার সতর্কবাণী, ‘ছেলেধরায় ছেয়ে গেছে দেশ। অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে আলাপ করলে বস্তায় ভরে চালান করে দিবে।’

ডেকের মেঝে ছেঁড়া কাগজ আর বিড়ির শেষাংশে সয়লাব। কেবিনের জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি কালিসীমা স্কুলটির দালান আর মাঠ। এখানেই নদীর পাশে একটা টিলার মত উঁচু অংশে অনেক অনেক ঝোপঝাড়, ইটের পাঁজা। বর্ষাকালে এটা মাথা উঁচু করে থাকে পানির মাঝখানে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেছেন এখানে নাকি সাপের স্বর্গরাজত্ব। এর থেকে একটু সামনেই বাঁকটি খুব শান্ত। অথচ গত রোজার ছুটিতে বর্ষায় এই ঘূর্ণিতে পড়ে আমাদের নৌকা ডুবতে বসেছিল। এরপর কান ধরেছিলাম দরকার হলে হেঁটে জালশুকা যাব, কিন্তু নৌকায় না।

লঞ্চ এগিয়ে চলেছে। অনেকক্ষণ আমরা কেবিনে বন্দী। আশেপাশে রফিক ভাই এলে ওনার তত্ত্বাবধানে আবার বেরোব। ইমন উসখুস করছে। তাকে শান্ত করতে আম্মা বাদাম কিনে দিলেন। কচুরিপানা, কলমিলতা দিয়ে বাঁশ ও জাল দিয়ে ঘেরা অনেক বাতা এখানে দেখলাম। এটাতে নাকি অনেক মাছ পাওয়া যায়। বাঁশের ডগায় বসে আছে পানকৌড়ি পাখি। আমরা দুজনকে কয় ধরনের পাখি দেখতে পেয়েছি হিসাব করছি। পানকৌড়ির সঙ্গে সঙ্গে বক, মাছরাঙা, কাক, চিল অ্যাভেয়েবল। আস্তে আস্তে দরজা দিয়ে মাথা বের করে ডেকে মুরব্বিকে দেখতে পেলাম না। ওনার জন্য আজকের জার্নিটাই মাটি। লঞ্চের গতি স্লো হয়ে আসছে। সামনে নাকি ভৈরবনগর ঘাট। বাঁ দিকের পাড়টি উঁচু। কোনো জেটি নেই, খালি একটা বেড়ার ঘর। লঞ্চের সাইরেন পেয়ে দূরে এক বাবা সিলভারের পাতিল এক হাতে অন্য হাতে বোরকা পরা ছোট এক মেয়েকে নিয়ে দৌড়ে আসছেন। মেয়েটি ইশারা করে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করছে। বেশ কয়েকজন বয়স্ক যাত্রী সারেংকে আরেকটু অপেক্ষা করতে অনুরোধ জানাচ্ছেন। কিন্তু, ইয়ং জেনারেশনের উত্তেজিত কিছু যাত্রী খুব বিরক্তি প্রকাশ করে তাড়াতাড়ি লঞ্চ ছাড়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছে। তাদের নাকি অনেক বড় পার্টির সঙ্গে মিটিং আছে। গ্রামীণ শান্ত নিরুদ্বিগ্ন জীবনে অচেনা মানুষের সহমর্মিতা একটি বিরাট ভরসা।

কিছু একটা হুঁশ করে নদীর মাঝখান থেকে পিঠ জাগিয়ে আবার নদীতে ডুবে গেল। আম্মাকে বললে—বললেন, ‘শুশুক’। এরা গাঙ্গেয় ডলফিন। এই শুশুক দেখার জন্য অনেকক্ষণ কেবিনের জানালা দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

গ্রাম্য কোন্দল ও স্মৃতির টান

হঠাৎ হইচই চিৎকার—কেউ কেউ চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে, ‘ব্যাড্ডা, আরও জুড়তে মার।’ লঞ্চের ডান দিকে কিছু একটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই দিকে প্রচুর মানুষকে তীর-ধনুক, বল্লম, গুলতি নিয়ে নদীর অপর দিকের মানুষদের হুমকি দিতে দেখলাম। এত দেখছি টেলিভিশনে দেখা ‘টারজান’ সিরিজের জংলিনৃত্য। এবার আমাদের আর কেউ রুখতে পারল না। দৌড়ে ডেকে চলে এলাম। একদিকে আছে মনিপুর গ্রামবাসী আর অন্যদিকের গ্রামবাসীদের পরিচয় জানতে পারিনি। গ্রাম্য কোন্দলে দুই পার্টি খুব উত্তেজিত। একটু দূরে দুই তীরে মহিলা ও গুঁড়াগাড়া ব্যাটালিয়নকে দেখতে পারছি। তখনই মনে পড়ল গত বছর আমাদের পার্শ্ববর্তী বড়াইল হোসাইনিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের অভিভাবক পরিষদের নির্বাচনে আমাদের গ্রামের প্রার্থীর সঙ্গে বিরামপুর গ্রামের প্রার্থীর মধ্যে উত্তেজনার কথা। আমরা বাংলা ঘরের সামনে আমগাছে বসে রুবেল-অপেলের সঙ্গে লবণ দিয়ে আম খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি দক্ষিণ দিকের সড়ক পার হয়ে প্রচুর লোকজন খেত থেকে বাড়ির দিকে চলে আসছে। তারা কিছুক্ষণ পর গ্রাম্য হাতিয়ার লাঠি, সড়কি নিয়ে বড়াইলের দিকে চলে যাচ্ছে। আবার কারও কারও হাতে বাঁশের তৈরি চিকন চিকন ফালি। এই হুড়োহুড়ি দেখে আমরা বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। এর মধ্যে দেখি জাহিদ কাকা বন্দুক নিয়ে বের হয়েছেন। আমাদের দ্রুত বাসার ভেতরে যেতে বললেন।

লঞ্চটি থেকে ডান দিকে তাকালে আলগা বাড়ি, আরও পেছনে বড়াইলের ফকিরবাড়ি-মাজার-স্কুল দেখা যাচ্ছে। একটু পশ্চিম দিকে তাকালে আমাদের জালশুকা প্রাইমারি স্কুলটি দেখতে পারছি। স্কুলটি দেখে জানে পানি এল। স্কুলের পাশেই আমাদের বাড়ি। পাওয়ারফুল একটা দুরবিন যদি থাকত তাহলে অবশ্যই দাদা-দাদিকে বাংলাঘরের কোনায় দেখতে পেতাম।

লঞ্চের স্পিড আস্তে আস্তে কমে আসছে। জেটিহীন গোঁসাইপুর ঘাটের উচুঁ তীর দেখতে পাচ্ছি। বটগাছটি আগের মতোই আছে। ভালো করে লক্ষ করে নুরু মিয়াকে দেখতে পারছি। দাদি ওনাকে পাঠিয়েছেন আমাদের ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে যাওয়ার জন্য।

হঠাৎ করে ঝাঁকুনি দিয়ে সিএনজি বেবিট্যাক্সি থেমে গেল। ড্রাইভার বললেন, ‘এট্ট নামতে হইব, বদগুনির ব্রিজটা ভাঙতাছে।’

ছোট্ট ফারহানকে আমি আদর করে বললাম, ‘আসলে, টাইম মেশিন আছে বাবু।’ তার উৎসুক চোখের দিকে তাঁকিয়ে বলি, ‘আল্লাহ এই যে আমাদের ব্রেনে টাইম মেশিন ফিট করে দিয়েছেন।’ এই টাইম মেশিনে চড়ে আমি চলে গেছি অনেকদিন আগে। দেখতে পেয়েছি আমার হারিয়ে যাওয়া দাদা, আম্মা, দাদি, রফিক ভাই, জাহিদ কাকা, ইধন ভাইসাব আর নুরুমিয়াকে।

লেখক: ডা. আসফাক বীন রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর।