নিমগাছি ডিগ্রি কলেজের বার্ষিক পিকনিক: গ্রিন ভ্যালি পার্কে প্রিয়জনদের মিলনমেলা
পেশাগত জীবনে দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শনীয় স্থানে শিক্ষাসফর ও পিকনিকে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু গতকালের দিনটি ছিল একেবারেই ভিন্ন। কারণ, এবারের আয়োজনটি কোনো আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ নয়, বরং শিকড়ের টানে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ফিরে আসার এক বিশেষ উৎসবের অনুভূতি নিয়ে এসেছে। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নিমগাছি ডিগ্রি কলেজ কর্তৃক আয়োজিত এই পিকনিকের গন্তব্য ছিল নাটোরের লালপুরে অবস্থিত গ্রিন ভ্যালি পার্ক।
শিকড়ের টানে ফিরে আসার যাত্রা
আমার জন্মভূমি এলাকার বন্ধুবান্ধব, অগ্রজ ও অনুজদের এই মহামিলনে অংশ নিতে আমি রওনা হয়েছিলাম আমার কর্মস্থল খুলনা থেকে। দূরত্বের ক্লান্তি ছাপিয়ে হৃদয়ে তখন কেবল নাড়ির টানে ফিরে যাওয়ার আকুলতা কাজ করছিল। সকালে রাজশাহীগামী কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে যখন ঈশ্বরদী স্টেশনে নামলাম, তখন স্মৃতির জানালাগুলো একে একে খুলতে শুরু করল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এক পুরোনো বন্ধু-সহপাঠী মিজানের সহযোগিতায় দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ যখন পার্কের মূল ফটকে পৌঁছালাম, তখন এক অভূতপূর্ব পরিবেশের মুখোমুখি হলাম।
গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের উষ্ণ সংবর্ধনা ও সহাস্য অভিবাদন মুহূর্তেই পথের সব ক্লান্তি দূর করে দিল। এই পিকনিকের সবচেয়ে বড় সার্থকতা ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধন। প্রায় ১৪০ জন প্রাণের মানুষের উপস্থিতিতে গ্রিন ভ্যালি পার্ক তখন মিনি রায়গঞ্জে পরিণত হয়েছে।
পুরোনো সখ্যতা ও নতুন পরিচয়ের মেলবন্ধন
অনেকের সঙ্গে দেখা হলো অনেক বছর পর। মাঝে সময়ের দীর্ঘ দেয়াল থাকলেও চোখের দেখায় যেন সেই পুরোনো সখ্যতা মুহূর্তে ফিরে এল। মজার বিষয় হলো, আমাদের অনেকের চেহারা ও অবয়বে বয়সের ছাপ পড়েছে। অনেকের মুখে দাড়ি, কাঁচাপাকা চুল—চিনতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই পরিচিত মানুষটি খুঁজে পেতে সময় লাগেনি। আবার এমন অনেকের সঙ্গে প্রথম দেখা হলো, যাঁরা শুধু নামেই জানতেন আমাকে, কোনো দিন দেখা হয়নি।
সবাই মিলে মেতে উঠেছিলাম হইহুল্লোড়, আড্ডা ও ছবি তোলায়। স্মৃতিগুলোকে ফ্রেমবন্দী করার পাশাপাশি চলল গান-কবিতা ও লটারির আয়োজন। ভাগ্যের ফেরে লটারিতে প্রথম পুরস্কারটিও জুটে গেল আমার কপালে। তবে সত্যি বলতে, সেই বস্তুগত পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি ছিল শৈশব-কৈশোরের সেই প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে কাটানো অমূল্য সময়টুকু।
জীবনের সার্থকতা ও বিদায়বেলার আবেগ
যান্ত্রিক জীবনে আমরা সবাই ছুটছি। কিন্তু মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে জীবনের পুরোনো পাতাগুলো উল্টে দেখার প্রয়োজন আছে বৈকি। নিমগাছি ডিগ্রি কলেজের এই মিলনমেলা আমাদের শিখিয়ে দিল—পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, শিকড়ের টান ও প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোই জীবনের আসল সার্থকতা। বিদায়বেলায় সবার মনে একটাই সুর ছিল—সম্পর্কের এই বন্ধন যেন অটুট থাকে চিরকাল।
এই আয়োজনটি শুধু একটি পিকনিক নয়, বরং এটি ছিল সম্প্রীতি ও স্মৃতির এক জীবন্ত উদাহরণ, যা অংশগ্রহণকারীদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন ধরে জ্বলবে।



