ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো থেকে নিপীড়নমূলক গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জোর করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতাও নেই। বিভিন্ন হলের ক্যানটিনের খাবারের মানও উন্নত হয়েছে। তবে অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে ক্যাম্পাসে ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন ও হেনস্তা করার সংস্কৃতি রয়ে গেছে।
ছাত্রলীগের পতন ও নতুন বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটে। আগে ‘শিবির সন্দেহে’ শিক্ষার্থীদের মারধর ছিল নিয়মিত ঘটনা, যা করত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। বর্তমানে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সন্দেহে বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে মারধর ও পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা দেখা যাচ্ছে।
অভ্যুত্থানের পর ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত নেতৃত্ব এখন শিবিরের। অধিকাংশ হল সংসদের নেতারাও শিবির-সমর্থিত। ছাত্রদল, বামধারা ও ইসলামপন্থী ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তিও সক্রিয়।
আবাসন ও গণরুমের পরিবর্তন
বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮টি হল ও ৫টি হোস্টেল রয়েছে। প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে থাকেন প্রায় ২২ হাজার। মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ‘লাদেন গুহা’ গণরুমে আগে ৬০ জন থাকতেন, এখন তা খেলার কক্ষে রূপান্তরিত। জহুরুল হক হলের টিনশেড ভবনের ১৮ নম্বর কক্ষে ২৫ জনের বেশি থাকতেন, এখন থাকেন ৮ জন।
শিক্ষার্থীদের মতামত
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী রাফসান ইসলাম বলেন, ‘আগে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করত ছাত্রলীগ। গণরুম ও গেস্টরুমে নির্যাতন হতো। এসব আর নেই। ক্যানটিনের খাবারের মানও উন্নত হয়েছে।’ তবে তিনি রেজিস্ট্রার ভবনে হয়রানি, শ্রেণিকক্ষ সংকট ও ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের সমস্যা এখনো বিদ্যমান বলে জানান।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দ্বীপজয় সরকার বলেন, ‘পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন ক্যাম্পাসে আর না ফেরে, সেটাই এখন সবার চাওয়া। কোনো ছাত্রসংগঠন যেন হল দখল ও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি চালু করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
মব আতঙ্ক ও নীতি পুলিশিং
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে ‘মব’ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী ও সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের বিরুদ্ধে মবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত ৯ মার্চ সেহরির সময় শিক্ষার্থী রাহিদ খানকে মারধর করে রক্তাক্ত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ করার অভিযোগ আনা হয়।
‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক জানায়, নিপীড়ন ও মবের ঘটনায় ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘প্রেশার গ্রুপ’ নাম দিয়ে ক্যাম্পাসে নীতি পুলিশিংকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে তারা মন্তব্য করে।
তবে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের দাবি করেন, ‘মানুষের চাওয়া-পাওয়ার জায়গা থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা জানিয়েছি। এটাকে যদি মব বলে, তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলে কিছু থাকে না।’
বিদ্যমান সংকট
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও প্রশাসনিক পদে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের দখল দেখা যাচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন ও শিক্ষক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। অছাত্ররা হল ছাড়ায় আবাসনসংকট কমলেও প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীরা সবাই হলে আসন পাচ্ছেন না।
কলাভবনে শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রকট। মনোবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, উর্দু, দর্শন, বাংলা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের একেক সময় একেক তলায় ক্লাস করতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে আসনসংকটও রয়েছে। কেন্দ্রীয় ও বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের মোট আসন ১ হাজার ৯০০, যা শিক্ষার্থী সংখ্যার অনুপাতে অপর্যাপ্ত।
প্রশাসনের বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘মবের ব্যাপারে আমাদের বার্তা পরিষ্কার। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও মব তৈরির চেষ্টা হলে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। আগে যা কিছুই হোক, এখন থেকে সবকিছু নিয়মের আলোকে করার চেষ্টা করছি।’



