বইয়ের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব
শিক্ষাবিদ তারিক মনজুরের ‘বাংলাদেশের শিক্ষাচিন্তা: স্কুল ও কলেজ পর্যায়’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সৌম্য প্রকাশনী। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে ৪৬টি নিবন্ধ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার সংকলিত হয়েছে, যা ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রচিত। লেখক নিজেই বলেছেন, ‘বইয়ের লেখাগুলো ২০২১-২৫ সময়পর্বের বাংলাদেশের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেবে। প্রায় প্রতিটি লেখার বিষয়ই সাম্প্রতিক; তাই এগুলোকে তাৎক্ষণিক ফেনার বুদবুদও বলা যায়। খুঁজলে এই বুদবুদের ভেতর বাংলাদেশের শিক্ষার ঐতিহাসিক পরিক্রমাও পাওয়া সম্ভব।’
শিক্ষার লিবারেল দর্শন
গ্রন্থটি প্লেটোর দর্শন থেকে শুরু করে মধ্যযুগের শিক্ষাভাবনা, ঊনবিংশ শতাব্দীতে কার্ডিনাল নিউম্যানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিংশ শতাব্দীতে কার্ল ইয়াসপার্স ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তাধারাকে একসূত্রে গেঁথে শিক্ষার একটি সুসংহত দর্শন নির্মাণ করে। এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক মুক্তি, যা ‘শিক্ষার মুক্তিবাদী আদর্শ’ নামে পরিচিত। শিক্ষার এই লিবারেল দর্শন দ্বারা প্রভাবিত তারিক মনজুর তাঁর গ্রন্থে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার নানা সমস্যার দিকে আলোকপাত করেছেন এবং সম্ভাব্য সমাধানও প্রস্তাব করেছেন।
নতুন শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি
বইটিতে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা স্থান পেয়েছে। লেখক নিজেই নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বাংলা বিষয়ের সামগ্রিক দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। পরীক্ষা ও মূল্যায়নপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি তিনি যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার; কারণ তিনি বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়েও নির্ভীকভাবে মত প্রকাশ করেছেন।
শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা ও সমাধান
লেখক দেখিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার প্রবণতা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে আসছে, অথচ শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মৌলিক চিন্তাশক্তি মূল্যায়নের উপযোগী প্রশ্ন প্রণয়নে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকেরা সফল হতে পারছেন না। পরীক্ষায় নকলের সংস্কৃতিও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভারসাম্যপূর্ণ অনুপাতের অভাব শিক্ষার মানকে ব্যাহত করছে। অনেক শিক্ষক নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিগত কোচিং বা প্রাইভেট পাঠদানেও যুক্ত, যা শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শিক্ষাক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্যতার পরিবর্তে অনেক সময় দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার দরুন দক্ষ ও কর্মক্ষম নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়। পাশাপাশি শিক্ষা বাজেট, শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান, পাঠ্যপুস্তকের তথ্য ও বানানগত ত্রুটি, নিম্নমানের কাগজ ও মুদ্রণ—এসব বিষয় নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। গ্রন্থের প্রতিটি নিবন্ধ ও শিরোনাম শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের বার্তা বহন করে।
বইয়ের বৈশিষ্ট্য ও প্রকাশনা তথ্য
সাক্ষাৎকারসহ বইয়ের সব লেখাই দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন নাজিব তারেক। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫২ এবং মূল্য ৪৮০ টাকা। লেখকের মতে, জ্ঞানের ক্রমবিকাশমান ধারা থেকেই আমাদের নতুন নীতি, মূল্যবোধ ও আদর্শের জন্ম হবে। গ্রন্থভুক্ত নিবন্ধগুলোর মূল শক্তি হলো জ্ঞানের এই বিকাশমানতার দর্শন। বাংলাদেশের শিক্ষাকাঠামো পুনর্বিন্যাস ও সময়োপযোগী সংস্কারের ক্ষেত্রে গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।



