উচ্চশিক্ষার আস্থা সংকট: পাবলিক-প্রাইভেট বিতর্কের উর্ধ্বে
উচ্চশিক্ষার আস্থা সংকট: পাবলিক-প্রাইভেট বিতর্কের উর্ধ্বে

এক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন—‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন পড়ি?’—উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ বলার মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সার্টিফিকেটের দোকান’ বলে চিহ্নিত করার এই বিতর্ক দ্রুত ‘মিম যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে।

বিতর্কের মূল: আস্থাহীনতা

এই বিতর্ক শুধু মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া নয়; বরং বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সমাজের ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক পরিচয় ও চাকরির সুযোগের মানদণ্ডে বিচার করছে। এটি উদ্বেগজনক, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ সত্য অনুসন্ধান, সমালোচনামূলক চিন্তা ও জ্ঞানচর্চা।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: ইয়েলের প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কমিটি অন ট্রাস্ট ইন হায়ার এডুকেশন’-এর প্রতিবেদন বলছে, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ২০১৫ সালে ৫৭% থেকে ২০২৪ সালে ৩৬%-এ নেমেছে। ২০২৫ সালেও ৭০% আমেরিকান মনে করেন উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা ভুল পথে হাঁটছে। কমিটি আস্থাহীনতার পেছনে তিনটি বাহ্যিক ও তিনটি অভ্যন্তরীণ কারণ চিহ্নিত করেছে: পড়াশোনার ব্যয় ও মূল্যের বিভ্রান্তি, ভর্তির ‘ব্ল্যাক বক্স’, মতপ্রকাশের একমুখী সংস্কৃতি এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা

বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কঠোর ও মুখস্থনির্ভর, যা কোচিং ব্যবসার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ডিগ্রি ইনফ্লেশন’ দেখা যায়। ইয়েলের রিপোর্টের মতো এখানেও ভর্তিপ্রক্রিয়া ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ—উপাচার্য নিয়োগ থেকে ছাত্রাবাসের সিট বণ্টন—সবকিছুই রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়, যা শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

জ্ঞানচর্চার অবক্ষয়

বাংলাদেশে গত ২০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার মান বাড়েনি। শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট পেলেও সমালোচনামূলক চিন্তা ও কারিগরি জ্ঞানে পিছিয়ে। নিয়োগদাতারা গ্র্যাজুয়েটদের অপ্রস্তুত মনে করেন। ইয়েলের রিপোর্টে বৌদ্ধিক স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে; বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে শিক্ষার্থী-শিক্ষকেরা মত প্রকাশে ভয় পান, যা জ্ঞান উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে।

সমাধানের পথ

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি একাডেমিক যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বাধীন বোর্ডের মাধ্যমে হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষাকে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ইয়েলের সুপারিশ অনুসারে ভর্তিপ্রক্রিয়া সহজ করা, একাডেমিক কঠোরতা ফিরিয়ে আনা ও বহুমাত্রিক মতামতের চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি।

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)। মতামত লেখকের নিজস্ব।