গতি কি সত্যিই আপেক্ষিক? প্রথমে একটি উদাহরণ দেখা যাক। একটি ট্রেন ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে উত্তর দিকে ছুটছে। ট্রেনের ভেতরে এক লোক ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটার বেগে দক্ষিণ দিকে হাঁটছে। প্রশ্ন হলো, লোকটি আসলে কোন দিকে এবং কত বেগে হাঁটছে? উত্তর নির্ভর করে প্রসঙ্গ কাঠামোর ওপর। ট্রেনের সাপেক্ষে লোকটির বেগ ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে, কিন্তু মাটির সাপেক্ষে তার বেগ ঘণ্টায় ১০০ - ৪ = ৯৬ কিলোমিটার উত্তরে। তাহলে কি মাটির সাপেক্ষে এই বেগই পরম? না, কারণ পৃথিবী নিজেও ঘুরছে, সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, এবং গ্যালাক্সির ভেতর দিয়ে ছুটছে। কোনো কিছুর পরম গতি মাপার জন্য কোনো স্থির প্রসঙ্গ কাঠামো নেই।
আপেক্ষিকতার জটিলতা ও ইথারের ধারণা
যদি গতির আপেক্ষিকতা এত সহজ হতো, তবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু বিষয়টি জটিল কারণ পরম গতি মাপার দুটি সহজ উপায় আছে বলে মনে হয়। প্রথমটি আলোর বেগ ব্যবহার করে, দ্বিতীয়টি জড়তা ব্যবহার করে। আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রথমটি নিয়ে কাজ করে, আর সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দ্বিতীয়টি নিয়ে।
উনিশ শতকে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মহাকাশে ইথার নামে একটি স্থির ও অদৃশ্য পদার্থ আছে, যা আলোর তরঙ্গ বহন করে। এই ইথারকে বলা হতো লুমিনিফেরাস ইথার। তাদের মতে, পুরো মহাবিশ্বজুড়ে ইথার ছড়িয়ে আছে এবং সব বস্তুর ভেতর দিয়ে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে। একটি কাচের বয়াম থেকে বাতাস বের করলেও সেটি ইথার দিয়ে ভরা থাকবে, কারণ শূন্যস্থানে আলো চলাচলের জন্য ইথার প্রয়োজন।
ইথারের সাপেক্ষে গতি মাপার পদ্ধতি
বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, ইথার নিজে স্থির, এবং অন্য সব বস্তু ইথারের সাপেক্ষে চলাচল করে। তাহলে কীভাবে ইথারের সাপেক্ষে পৃথিবীর গতি মাপা সম্ভব? উত্তর হলো, পৃথিবীর গতি ও আলোর গতি তুলনা করে। আলো হলো তড়িৎ–চৌম্বকীয় তরঙ্গের একটি অংশ। এই নিবন্ধে 'আলো' বলতে সব ধরনের তড়িৎ–চৌম্বকীয় তরঙ্গ বোঝানো হবে।
একটি চলন্ত জেট প্লেন থেকে গুলি ছোড়া হলে, মাটির সাপেক্ষে গুলির বেগ প্লেনের বেগ ও গুলির বেগের যোগফল হয়। কিন্তু আলোর বেলায় ব্যাপারটি ভিন্ন। উৎসের গতি আলোর গতিকে প্রভাবিত করে না। উনিশ শতকের শেষের দিকের পরীক্ষাগুলো এবং পরবর্তীতে নিউট্রাল পাই মেসনের ভাঙন নিয়ে করা পরীক্ষা এটি প্রমাণ করেছে।
আলোর বেগের স্থিরতা
১৯৫৫ সালে রুশ জ্যোতির্বিদেরা সূর্যের দুই প্রান্ত থেকে আসা আলোর বেগ পরীক্ষা করেন। সূর্যের এক প্রান্ত পৃথিবীর দিকে আসছে, অন্যটি দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা গেল, উভয় প্রান্ত থেকে আলো একই বেগে পৃথিবীতে পৌঁছায়। জোড়া নক্ষত্র থেকেও একই ফল পাওয়া গেছে। শূন্যস্থানে আলোর বেগ সব সময় একই – সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটার (৩ লাখ কিলোমিটার বলা হয়)।
এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে একজন পর্যবেক্ষক তার পরম গতি মাপতে পারেন। যদি আলো স্থির ইথারের ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট বেগে (c) চলে এবং এই বেগ উৎসের গতির ওপর নির্ভর না করে, তাহলে পর্যবেক্ষক আলোর বেগকে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যে পর্যবেক্ষক আলোর সঙ্গে একই দিকে ছুটছেন, তাঁর কাছে আলোর বেগ c-এর চেয়ে কম মনে হবে; আর যে আলোর দিকে ছুটছেন, তাঁর কাছে বেশি মনে হবে। এই পার্থক্যই ইথারের সাপেক্ষে পর্যবেক্ষকের পরম গতি নির্দেশ করবে।
ইথার বায়ু ও তার প্রভাব
পদার্থবিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে 'ইথার বায়ু' বলে ডাকেন। বোঝার জন্য একটি বদ্ধ গাড়ির উদাহরণ নেওয়া যাক। গাড়ির ভেতরে শব্দের বেগ সব দিকে একই থাকে, কারণ বাতাস গাড়ির সঙ্গে চলে। কিন্তু খোলা মালবাহী ট্রেনের বগিতে বাতাস বাইরের সাথে মিশে যায়। ট্রেন যদি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে ছোটে, তাহলে বগির ওপর দিয়ে উল্টো দিকে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইবে। এই বাতাসের কারণে ট্রেনের পেছন থেকে সামনে শব্দের বেগ কমে যাবে, আর সামনে থেকে পেছনে বেড়ে যাবে। ইথার বায়ুর ধারণাও একই রকম, তবে ইথার স্থির এবং আলোর বেগের ওপর এর প্রভাব পড়ে।



