নরসিংদীর রায়পুরায় কলেজ অধ্যক্ষের ওপর হামলা, বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে এক নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে কলেজের অধ্যক্ষ মো. নূর সাখাওয়াত হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়, যেখানে তাকে তার কার্যালয় থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হয়। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
হামলার বিস্তারিত বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, অধ্যক্ষ নূর সাখাওয়াত হোসেন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কলেজে উপস্থিত হয়ে দাপ্তরিক কাজ করছিলেন। এসময় এলাকার আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক অতর্কিতভাবে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে এবং তারা অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। একপর্যায়ে তারা অধ্যক্ষের উপর সরাসরি হামলা চালিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। হামলাকারীরা তাকে টেনেহিঁচড়ে অফিস কক্ষ থেকে বের করে বারান্দায় নিয়ে এলোপাতাড়ি কিলঘুষি মারতে থাকে।
হট্টগোলের শব্দে কলেজের অন্যান্য শিক্ষক ও কর্মচারীরা এগিয়ে আসলে হামলাকারীরা অধ্যক্ষকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দ্রুত চলে যায়। পরে খবর পেয়ে রায়পুরা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর থেকে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে, এবং তারা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অধ্যক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগ
এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ নূর সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এলাকার আমজাদ হোসেন ও নাজমুল হোসেন বাদলের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী অফিস কক্ষে ঢুকে আমার কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা আমার ওপর হামলা চালায়। এসময় কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীগণ এগিয়ে আসতে থাকলে সন্ত্রাসীরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায়।’ তিনি আরও জানান, এ ব্যাপারে রায়পুরা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ভিডিও প্রমাণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ঘটনার ৪৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে দেখা যায় কয়েকজন নূর সাখাওয়াত হোসেনের কোমরের অংশের প্যান্টে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের ‘না করছিলাম না’, ‘ধর’ বলতে শোনা যায়। অভিযুক্ত নাজমুল আদিয়াবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং আমজাদ হোসেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদে আছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ২৬ জানুয়ারি অধ্যক্ষ নূর শাখাওয়াত হোসেনকে স্বপদে বহাল রাখার দাবিতে কলেজের প্রধান ফটকের সামনে অভিভাবক, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা একটি মানববন্ধনের আয়োজন করে। ওই মানববন্ধনকারীদের অভিযোগ ছিল, ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক ও তার সমর্থকেরা মানববন্ধনে হামলা চালান এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া ও পুলিশের পদক্ষেপ
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে একাধিকবার মুঠোফোনে ফোন করা হলেও আমজাদ হোসেন কল রিসিভ করেননি। আদিয়াবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক বাদল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি আজকের এই ঘটনায় কিছুই জানি না। আমি ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি। এলাকার কেউ গিয়েছে কি না, জানি না।’
রায়পুরা থানার ওসি মজিবুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে, এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচার ও জবাবদিহিতার দাবি জোরালো হচ্ছে।



