জাল সনদধারী শিক্ষক শনাক্তে ডিআইএর তৎপরতা, সরকারি পাওনা ৮৩৫ কোটি টাকা
বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাল সনদধারী আরও ৮১৭ জন শিক্ষককে শনাক্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। এ নিয়ে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করা শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪৯ জনে। সরকারের হিসাবে, এই শিক্ষকদের কাছ থেকে মোট ৮৩৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল অর্থ উদ্ধারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তদন্ত ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া
ডিআইএ ২০২১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছর ২০২৬ সাল পর্যন্ত বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রায় ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরেজমিন তদন্ত করেছে। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত জাল সনদধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৮১৭ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৫০০ জন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। আগামী রবিবার এই তালিকাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। বাকি ৩১৭ জন স্কুল-কলেজের শিক্ষক।
গত সপ্তাহে ৪৭১ জন জাল সনদধারীর তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে পাঠানো হয়েছে। ডিআইএ এই তালিকায় থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (এমপিও) বন্ধ, মামলা দায়ের, বেতন-ভাতা বাবদ নেওয়া অর্থ ফেরত আদায়সহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
অব্যাহত অনিয়ম ও চ্যালেঞ্জ
ডিআইএ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ১৫৪ জন শিক্ষকের সনদ জালিয়াতির প্রমাণ পেয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর মন্ত্রণালয় ঐ বছরের এপ্রিলে অভিযুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসে। বৈঠকে অভিযুক্ত শিক্ষকরা কোনো সদুত্তর দিতে না পারায় তাদের চাকরি থেকে বরখাস্তের পাশাপাশি প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ফেরত আনার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এখনো তাদের বরখাস্ত করা হয়নি।
ডিআইএর আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সীমিত জনবল নিয়েও সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করে নানা অনিয়ম খুঁজে বের করি আমরা। তবে মন্ত্রণালয়ের এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কারণে জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে জাল সনদধারীদের নিয়োগ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। জাল সনদধারীদের নিয়োগ বন্ধ না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ও রোধ করা যাবে না।’
জাল সনদের ধরন ও আঞ্চলিক বণ্টন
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তালিকায় মোট ৪৭১ জন শিক্ষক-কর্মচারীর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে:
- ১৯৪ জন শিক্ষকের বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সনদ জাল করে চাকরি নিয়েছিলেন।
- ২২৯ জন কম্পিউটার সনদ জাল করে চাকরি করছেন।
- ৪৮ জন শিক্ষকের বিপিএড, বিএড, গ্রন্থাগার ও অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ময়মনসিংহের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ডিআইএর পাঠানো জাল সনদধারীদের তালিকাটি চিঠির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) পাঠানো হয়েছে। যেহেতু তাদের বেতন-ভাতা মাউশির মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাই এ বিষয়ে মাউশিকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
আদালতের মামলা ও বাধা
২০১২ সাল থেকে জাল সনদ শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে ডিআইএ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ বিষয়ে জোরদার অভিযান চালাচ্ছে শিক্ষা প্রশাসনের পুলিশ খ্যাত এই সংস্থাটি। এরই ধারাবাহিকতায় স্কুল-কলেজের জাল সনদধারীদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
এর আগে ২০২৩ সালের শুরুতে স্কুল-কলেজের ৬৭৮ জন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসার প্রায় ২০০ জন জাল সনদধারীর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল সংস্থাটি। সে সময় মন্ত্রণালয় জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে মামলাসহ একাধিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয়ের ঐ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে। আদালতে মামলা চলমান থাকায় অনেক জাল সনদধারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি সরকার।
ডিআইএ পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডিআইএর জনবল সংকট রয়েছে। এছাড়া নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। জাল সনদ এবং প্রতিষ্ঠানের জমি বেহাত হওয়ার বিষয়টি প্রতিটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে গুরুত্বসহ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনিয়ম তুলে ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।’
বর্তমানে ৬৭৮ জন শিক্ষকের চলমান বেতন-ভাতা বন্ধ করা হয়েছে। তবে বাকি জাল সনদধারী শিক্ষকরা এখনও বেতন পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাল সনদ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া ব্যক্তিদের সরকারের কাছ থেকে নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়; এসব শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।



