শিক্ষাখাতে ১৩টি বড় চ্যালেঞ্জ: বরাদ্দ কম, সংকট জটিল, সংস্কার জরুরি
প্রতিবছর শিক্ষাখাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও শিক্ষার গুণমান নিশ্চিত করা যায়নি। নানা সংকটের মধ্যেই নতুন সরকারের সামনে শিক্ষাখাতে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
শিক্ষাখাতের প্রধান সংকটসমূহ
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা। তবে শিক্ষাখাতে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- শিক্ষক সংকট ও উচ্চ শিক্ষায় একই শিক্ষক দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা দেওয়া
- কারিগরি শিক্ষায় নারীদের কম অংশগ্রহণ ও দক্ষতা তৈরির অভাব
- ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি
- প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি ও মাধ্যমিকে কম ভর্তি
- ভর্তির ক্ষেত্রে ধনী-গরিবের ব্যবধান প্রকট হওয়া
- মাদ্রাসা শিক্ষার মান চাকরির বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত সন্তোষজনক নয়
- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিদের মালিকানা মনোভাব
- গবেষণার জন্য মানসম্মত ফ্যাকাল্টির অভাব
বরাদ্দের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বাংলাদেশ
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাখাতে সরকারি বরাদ্দ জিডিপি অনুপাতে গত ২২ বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্নে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাখাতে অন্তত জিডিপির ছয় ভাগ বা বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ ব্যয় হওয়া উচিত।
তবে দেশে বছরের পর বছর এ বরাদ্দ জিডিপির দুই শতাংশ এবং বাজেটের ১২ শতাংশের আশপাশেই সীমাবদ্ধ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ১৮৯টি সদস্য দেশের মধ্যে যে ১০টি দেশ অর্থনীতির আকারের তুলনায় শিক্ষাখাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়, বাংলাদেশ তার একটি।
একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, শিক্ষায় বারবার শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কারণে আমরা আন্তর্জাতিক মান থেকেও পিছিয়ে পড়ছি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত, কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম।
দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কারিকুলাম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
কারিগরি শিক্ষায় বেহাল দশা
দেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষা বেশ জনপ্রিয় হলেও দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও ডিপ্লোমা প্রকৌশল কোর্সে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের বেশি মেয়ে ভর্তি হয় না। এর মূল কারণ কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে অভিভাবকের অসচেতনতা।
বিভিন্ন পলিটেকনিক, মনোটেকনিক এবং কারিগরি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক পদের ৭০ শতাংশই শূন্য আছে। এছাড়া জনশক্তি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যুরোর অধীন কারিগরি প্রতিষ্ঠানেও প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এক শিফটের শিক্ষক দিয়ে চালানো হচ্ছে দুই শিফট।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা প্রতিশ্রুতি
বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষার বিষয়গুলো হলো:
- শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ প্রদান
- ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন
- সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা ও আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি
- শিক্ষাখাতে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য নিরসন
- শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন
শিক্ষা প্রশাসনে বদলির আতঙ্ক
এদিকে শিক্ষা প্রশাসনে এখনো অনেকের মধ্যে বদলির আতঙ্ক কাজ করছে। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন প্রশাসনিক পদে আছেন এবং চাকরির মেয়াদ শেষের দিকে, তাদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেশি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় বড় ধরনের রদবদল হতে পারে—এমন ধারণা থেকেই অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছেন।
শিক্ষাখাতে গুণগত পরিবর্তন আনতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কার—এই চারটি ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
