গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাসের চ্যালেঞ্জ: বৈষম্য ও বাস্তবতা
করোনা মহামারির মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর একপর্যায়ে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে বসে ক্লাস করার এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। তবে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীর ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংকটময় সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব
শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেক পরিবারের একটি মোবাইল ফোনই একমাত্র ভরসা, যা দিয়ে একাধিক শিক্ষার্থীর পক্ষে নিয়মিত অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ ও বিদ্যুৎ সমস্যার মতো প্রতিবন্ধকতা। এই সমস্যাগুলো গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিভাবকদের সচেতনতার সীমাবদ্ধতা
অভিভাবকদের সচেতনতার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। অনেক গ্রামীণ অভিভাবক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নন, ফলে সন্তানেরা আদৌ অনলাইন ক্লাসে অংশ নিচ্ছে কি না, তা তদারকি করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে অনলাইন ক্লাসের সুযোগ অনেক সময় অপব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতিমধ্যেই কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইন গেমিং বা অন্যান্য অনলাইন আসক্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা তাদের পড়াশোনার প্রতি অনীহা তৈরি করছে।
শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির প্রবণতা
এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা রয়েছে। অনেকে পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি করে, সময় কাটায় আড্ডায় বা বাইরে ঘুরেবেড়িয়ে। অনলাইন ক্লাস চালু হলে সরাসরি তদারকির অভাবে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে অভিভাবক ও শিক্ষকদের আশঙ্কা। এই বিষয়টি শিক্ষার গুণগত মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষকদের প্রস্তুতির অভাব
শিক্ষকদের প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস পরিচালনায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এখনো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসগুলো আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া অনলাইন শিক্ষা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সার্বিক মূল্যায়ন
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর এই উদ্যোগ সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর না–ও হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন আরও বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা। অন্যথায় এই সিদ্ধান্ত শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গ্রামীণ এলাকার চাহিদা ও সমস্যাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।



