জিসি স্কুলে ঈদের মিলনমেলা: শতবর্ষী প্রাঙ্গণে স্মৃতির টানে ফিরে আসে প্রজন্ম
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার হৃদয়ভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা গিরিশচন্দ্র পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, যা জিসি স্কুল নামে পরিচিত, আজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি হয়ে উঠেছে এক আত্মীয়তার ভূগোল, যেখানে ঈদের উৎসবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের শিকড় খুঁজে পায়। এই শতবর্ষী স্মৃতিবৃক্ষের প্রাঙ্গণে সন্ধ্যা নামার আগেই নামবে মানুষের ঢল, বাতাসে মিশবে উচ্ছ্বাস আর নস্টালজিয়ার কম্পন।
ঈদের আগের দিন: ইফতারে শুরু হয় মিলনের মহড়া
ঈদের এক দিন আগে সন্ধ্যায় জিসি স্কুলের প্রাঙ্গণে গেলে মনে হবে কোনো মেলায় এসেছেন। বিভিন্ন ক্লাসরুম ও স্কুল চত্বরে শামিয়ানা খাটানো হয়েছে। একেক ব্যাচ আলাদা আলাদাভাবে, কিন্তু একসঙ্গে ইফতারের আয়োজন করেছে। ১৯৯৫ সালের ব্যাচের ইফতার মাহফিলে শিল্পী, কাজল, শামীম, শিমুল, দীপঙ্কর, কৃষ্ণ, পলাশ দত্তদের মতো সাবেক শিক্ষার্থীরা একত্র হয়েছেন। কেউ এসেছেন সস্ত্রীক, কেউ সপত্নীক, কারও সঙ্গে ছেলেমেয়ে। বহু বছর পর দেখা হওয়ার পর একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে বলছেন, ‘বন্ধু, কী খবর বল! কত দিন দেখা হয়নি।’
এই খোঁজ নেওয়ার মুহূর্তগুলোতে সময়ের ভাষা বদলে যায়। কেউ বলছেন তার সন্তানের কথা, কেউ ব্যস্ততার গল্প, কেউবা অপ্রকাশিত কষ্টের কথা। তখন এ কথাগুলো সাধারণ কথোপকথন থাকে না; হয়ে ওঠে এক আত্মার স্পর্শ, এক নিঃশব্দ আলিঙ্গন। ইফতারের টেবিলে বসে তারা হাসছেন, গল্প করছেন, ঠাট্টায় মেতে উঠছেন। ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে স্মৃতির দরজা—স্কুলের ধুলোমাখা মাঠ, ক্লাসরুমের জানালা, শিক্ষকের কড়া দৃষ্টি আর বন্ধুর গোপন হাসি সব ফিরে আসছে একে একে।
ঈদের দিন: ক্রিকেট লিগে সময়ের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা
ঈদের দিন জিসি স্কুলে এক বিস্তৃত আনন্দের বিস্ফোরণের দিন। সকাল থেকে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ। কারণ, আজ ‘খেলা হবে’! সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়, ২০১৪ বনাম ২০১৫ সালের এসএসসি ব্যাচের খেলা দিয়ে শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত লিগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ১৯৯৫ সালের ব্যাচ থেকে ২০২০ সালের ব্যাচের পাঁচ ওভারের টান টান উত্তেজনার ক্রিকেট লিগে অংশ নেবে ২৫টি টিম। এই খেলা চলবে টানা তিন দিন।
এই খেলা কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়; এটি সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের এক প্রতীকী প্রতিযোগিতা। যারা একদিন একই ক্লাসরুমে বসে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তারা আবার এক মাঠে দাঁড়িয়ে। তারা মুখোমুখি হবে; কিন্তু প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং একে অপরের অস্তিত্বকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য। প্রতিটি শট, প্রতিটি রান, প্রতিটি উল্লাস যেন তাদের ভেতরের সেই কিশোর সত্তাটিকে আবার জাগিয়ে তুলবে।
মিলনের ভেতর লুকানো মানবিক সত্য
এই মিলনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর মানবিক সত্য। কেউ আজ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ উকিল, কেউবা ড্রাইভার, পিয়ন বা রাজমিস্ত্রি—কিন্তু এখানে এসে সব পরিচয় যেন গলে যায়। সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক পার্থক্য, ধর্মীয় ভেদরেখা—সবই ম্লান হয়ে যায় একটিমাত্র পরিচয়ের সামনে—তারা সবাই বন্ধু। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান—একই সারিতে বসে ইফতার করছেন। এমনকি রাজনীতির বিভাজনের রেখাও এখানে টানতে পারে না সীমা। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি—এ পরিচয়গুলো এই প্রাঙ্গণের বাইরেই ‘পার্ক করা’ ছিল।
গিরিশচন্দ্র পাইলট হাইস্কুলের এই ঈদ-উৎসব নিছক একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান নয়; এটি এক সামাজিক দর্শন। এখানে দেখি—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পেশা, ধর্ম বা রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বরং তার স্মৃতি, তার সম্পর্ক, তার একসঙ্গে থাকার ক্ষমতা। মানুষ যেহেতু তার স্মৃতির মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বেঁচে থাকে, সেহেতু সেই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ হলো—একসঙ্গে থাকার মুহূর্তগুলো। এই খেলার প্রতিটি রান, প্রতিটি উল্লাস, প্রতিটি করতালি বলে উঠবে ‘আছি, আমরা হারাইনি, আমরা এখনো একসঙ্গে আছি। আমরা এখনো একসঙ্গে বাঁচি!’



