প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনছে সরকার
প্রায় দেড় দশক পর আবারও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শ্রেণিতে ভর্তির জন্য পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে সরকার। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্যও লটারি পদ্ধতি থাকবে না, বরং পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বের পরদিনই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
সংসদে উত্থাপিত প্রশ্ন ও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
১৫ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে একজন সংসদ সদস্য বর্তমান ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে আগে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি নেওয়া হলেও বর্তমানে লটারির মাধ্যমে শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। এতে প্রাথমিক শিক্ষার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে মানসম্পন্ন শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শহরে ভর্তি সংকটের কারণে অতীতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হলেও এটি পুরোপুরি যুক্তিসংগত নয়। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ভর্তির পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তিনি সংসদে জানিয়েছিলেন।
শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপের আশঙ্কা
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্যও পরীক্ষা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যে শিশু স্কুলে যাওয়ার পর পড়তে ও লিখতে শেখে, তাকে এখন স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই পড়তে-লিখতে শিখতে হবে। শুধু শিখলেই হবে না, ভর্তিযুদ্ধে পাল্লা দেওয়ার মতো করে প্রস্তুতি নিতে হবে।
ঢাকার স্কুলগুলোর প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় এমন সব প্রশ্ন থাকত, যেগুলো দেখলে মনে হয় শিক্ষার্থী বুঝি প্রথম শ্রেণির নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে! ২০১০ সাল পর্যন্ত যখন ভর্তি পরীক্ষা চালু ছিল, তখন এমনও দেখা গেছে, ‘ভালো’ স্কুলে ঢোকার জন্য দ্বিতীয় শ্রেণি পার হওয়া শিক্ষার্থীরাও প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে।
কোচিং-প্রাইভেটের দৌরাত্ম্য বাড়ার শঙ্কা
লটারির বদলে আবার ভর্তি পরীক্ষা চালু করার ফলে নিশ্চিতভাবেই কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর দৌরাত্ম্য বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আগের মতো অর্থ লেনদেন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠতে পারে। নানা সমালোচনার কারণেই সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
মাধ্যমিক শ্রেণির জন্য ‘মেধা’র প্রসঙ্গ স্বীকার করে নেওয়া গেলেও প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থীকে মেধাক্রমে মূল্যায়নের ব্যাপারটি গ্রহণযোগ্য নয়; বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য তো নয়ই।
স্কুলগুলোর ব্যবধান কমানোর প্রয়োজনীয়তা
সরকারের বরং বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার ‘ভালো’ স্কুল ও ‘খারাপ’ স্কুলের ব্যবধান কমিয়ে আনার দিকে। কারণ, ভালো স্কুল বিবেচনা করে অভিভাবকেরা শিশুকে বাসা থেকে দূরের স্কুলে ভর্তি করতেও দ্বিধা করেন না। এভাবে প্রতিদিন দূরের রাস্তায় আসা-যাওয়ার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার্থীকে অযাচিত কষ্ট দেওয়া হয়।
সরকারি স্কুলগুলোর ব্যবধান কমানোর জন্য এগুলোকে প্রায় একই ক্যালেন্ডার ও পদ্ধতির মধ্যে আনা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের ক্লাসরুটিন ও অন্যান্য কার্যক্রম একই ধারা ও তারিখ অনুসরণ করে চলবে।
শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রত্যক্ষ তদারকি প্রয়োজন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হয়। আর শিক্ষার মান যদি বাড়াতেই হয়, তবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপরও জোর দিতে হবে।
গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দেখা যায়, স্কুলশিক্ষকদের একটা বড় অংশ পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও ভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন। শিক্ষকদের বেতন–ভাতা বাড়ানো না গেলে এই প্রবণতা থেকে তাঁদের বের করে আনা কঠিন।
শিক্ষাবিদদের মতামত
অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর শিক্ষার বনিয়াদ তৈরি হয়। এই শিক্ষা উচ্চশিক্ষার মানকেও প্রভাবিত করে। কিন্তু কোনো স্তরের একটি ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত শিক্ষার সামগ্রিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তারিক মনজুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মতামত লেখকের নিজস্ব।
