মুরইছড়া চা-বাগানে সাগর তির্কীর একক প্রচেষ্টায় বন্ধ স্কুলে ফিরেছে শিক্ষার আলো
বাংলাদেশের চা-বাগান এলাকাগুলোর জীবনযাত্রা মূলধারার শহুরে বাস্তবতা থেকে অনেকটাই আলাদা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রমনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত পরিবারগুলোর কাছে শিক্ষা প্রায়ই বিলাসিতার মতো মনে হয়। আর্থিক অনটন, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনা নিয়মিত হয়ে ওঠে না।
স্কুল বন্ধ হওয়ার পটভূমি
মুরইছড়া চা-বাগানেও এমনই এক বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল। এখানকার একটি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র ২০২৩ সালে বিভিন্ন জটিলতা ও আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলঘরটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে, জানালায় ধুলো জমে, বেঞ্চে মাকড়সার জাল দেখা দেয় এবং উঠানে আগাছা জন্মায়। একটি স্কুলঘরের সাথে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে বহু শিশুর স্বপ্নও।
স্কুল না থাকায় অনেক শিশু পড়াশোনার অভ্যাস হারাতে শুরু করে। কেউ দিন কাটাতো এদিক-ওদিক ঘুরে, কেউবা পরিবারের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ত। বইয়ের পাতার বদলে জীবনের কঠিন বাস্তবতাই হয়ে উঠেছিল তাদের প্রতিদিনের পাঠ।
সাগর তির্কীর একক উদ্যোগ
এই দৃশ্য মেনে নিতে পারেননি সাগর তির্কী। নিজের দায়িত্ববোধ আর শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, স্কুলটি আবার চালু করতেই হবে। ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি নিজ উদ্যোগে বন্ধ স্কুলঘর পরিষ্কার করা শুরু করেন। ধুলো জমা বেঞ্চ পরিষ্কার করেছেন, ভাঙা অংশ মেরামত করেছেন এবং পরিত্যক্ত ঘরটিকে আবার পাঠশালায় পরিণত করেছেন।
আজ তিনি একাই শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ব্যাচ ভাগ করে পড়ান। কখনও অ আ ক খ-এর সরল সুর, কখনও গুণের নামতার তাল, কখনও কবিতার আবৃত্তিতে ভেসে ওঠা কচি কণ্ঠ, ছোট্ট সেই ঘরটি আবার জেগে ওঠে স্বপ্ন আর প্রাণের উচ্ছ্বাসে।
রবির সহায়তা ও পরিবর্তন
তবে পথটি ছিল কঠিন। স্কুলে ছিল না পর্যাপ্ত বই-খাতা বা খেলাধুলার সামগ্রী। তবুও থেমে থাকেননি সাগর তির্কী। সীমাবদ্ধতার মাঝেই তিনি শিশুদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে গেছেন।
এ সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় রবি। তাদের ক্যাম্পেইন ‘ছোট্ট একটা কাজে হাজারো ইচ্ছেপূরণ’-এর একটি উদ্যোগ হিসেবে স্কুলের শিশুদের জন্য ব্যাগ, বই-খাতা, খেলাধুলার সামগ্রী, SMART TV, RobiWifi-এর ফ্রি কানেকশন এবং পানির ফিল্টার সরবরাহ করা হয়। ছোট্ট এই সহায়তা পুরো পাঠশালার অভিজ্ঞতাকে বদলে দিয়েছে। শেখা হয়েছে আরও আনন্দময়, সহজ ও নিরাপদ।
সাগর তির্কীর একার চেষ্টায় স্কুলটি জীবন্ত হয়েছে, আর রবির সহযোগিতায় সেই ছোট্ট উদ্যোগের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে অনেকগুলো পরিবারের ভবিষ্যতে।
গল্পের মূল বার্তা
তবে এই গল্পের আসল শক্তি কোনো উপকরণে নয়, বরং একজন মানুষের অটল বিশ্বাসে। সাগর তির্কীর একার চেষ্টায় একটি বন্ধ স্কুল আজ অনেক শিশুর স্বপ্নের ঠিকানা। যেখানে একসময় নীরবতা ছিল, সেখানে এখন প্রতিদিন শোনা যায় পাঠের শব্দ, হাসি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
মুরইছড়া চা-বাগানের এই ছোট্ট স্কুলঘর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় উদ্যোগ লাগে না। কখনও কখনও একজন মানুষের ছোট্ট সিদ্ধান্ত আর পাশে দাঁড়ানোর সহায়তাই হয়ে ওঠে বহু জীবনের নতুন শুরু। ছোট ছোট ভালো কাজের মাধ্যমে এমন পরিবর্তন আনতে পারে যে কেউ।
