স্কুল গেটে কাঁটাতারের বেড়া, শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরল: তানোরের উদ্বেগজনক ঘটনা
স্কুল গেটে কাঁটাতারের বেড়া, শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরল

স্কুল গেটে কাঁটাতারের বেড়া: শিক্ষার্থীদের জন্য বেদনাদায়ক প্রতিবন্ধকতা

রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলায় একটি উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে জুমার পাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একমাত্র প্রবেশপথে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই অবৈধ বাধার কারণে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পর শেষ পর্যন্ত স্কুলে প্রবেশ করতে না পেরে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি একপ্রকার অবমাননা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা সমাজে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

দীর্ঘদিনের পথে হঠাৎ দখলদারিত্ব

প্রায় ২৫ বৎসরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত এই পথটি হঠাৎ করে কেউ কীভাবে নিজের বলে দাবি করতে পারে, তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই স্থানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া এবং দোকানঘর নির্মাণের চেষ্টা কেবল আইন অমান্য নয়, বরং এটি একপ্রকার অমানবিক কর্মকাণ্ডও বটে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েও এর কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারেননি, যা প্রশাসনের দুর্বলতা নির্দেশ করে।

জমি দখলের প্রবণতা: একটি জাতীয় সমস্যা

সরকারি খাসজমি, রেলওয়ে সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি মসজিদ-মন্দিরের জায়গা-জমির উপর লোলুপ দৃষ্টি একশ্রেণির দুষ্টপ্রকৃতির মানুষের যেন মজ্জাগত হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে জমিজমাসংক্রান্ত জটিলতা থাকতে পারে, কিন্তু শিক্ষার পরিবেশকে জিম্মি করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা লক্ষ্য করছি যে, দিনদিন জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে আজকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গাজমি গ্রাস করে নিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুরা, যাদের বিবেকের কোনো দংশন নেই।

কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও সমাধানের পথ

অবশ্য অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমির দলিল সংরক্ষণ বা সীমানা নির্ধারণে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা রয়েছে, যা দখলদারদের জন্য মহাসুযোগ করে দিচ্ছে। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা কোনো ব্যক্তিগত বিবাদের ক্ষেত্র হতে পারে না। এই জন্য প্রথমত, অবশ্যই নিষ্কণ্টক ও অবিতর্কিত জমিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈধ জায়গা-সম্পত্তি যাতে কেউ দখল করতে না পারে, সেই জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বদা সজাগ থাকা প্রয়োজন।

তাত্ক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের আহ্বান

আলোচ্য ঘটনায় অনতিবিলম্বে ঐ কাঁটাতারের বেড়া অপসারণ করতে হবে। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ইনজাংশন জারি করে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেইখানে যদি জমির মালিকানা নিয়ে প্রকৃতই কোনো প্রকার জটিলতা থাকে, তাহলে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীদের জন্য স্থায়ী ও নিষ্কণ্টক বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা করা আবশ্যক। আমরা মনে করি, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমির সীমানা ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজের আওতায় আনতে পারলে ভবিষ্যতে কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি অবৈধ দখলের দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।

শিক্ষার উপর আঘাত রুখতে সমাজের ভূমিকা

শিক্ষার উপর এমন আঘাত রুখে দিতে স্থানীয় সুধী সমাজ ও অভিভাবকদের সোচ্চার হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির নয়, এটি জাতির সম্পদ। আমরা বলি, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, এবং সেই মেরুদণ্ডের উপর কোনো প্রকার আঘাত আসাটা দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করার আরো নানা অপচেষ্টা ও অপকৌশল পরিলক্ষিত হয়, যেমন অনেক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার জায়গাজমি অবৈধভাবে ও জোরপূর্বক ভোগদখল করা হয় বৎসরে পর বৎসর।

শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য যাতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে; কিন্তু সেই মাঠে অনেক সময় হাট-বাজার বসানো হয়, গরু-ছাগলও চরতে দেখা যায়। ইদানীং স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বিবাহশাদির অনুষ্ঠান আয়োজন করতেও দেখা যায়, যা কাহারও কাম্য হতে পারে না। মোটকথা, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রমে কোনো প্রকার বাধাবিঘ্ন যাতে না আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে, এবং এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।