প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা চালু: শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ ও বিকল্প মূল্যায়নের আহ্বান
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে নতুন করে পরীক্ষা চালু করার নির্দেশ দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে নিশ্চয়ই কিছু যুক্তি কাজ করেছে, যেমন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং তাদের অবস্থা বোঝা। তবে শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন।
শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন ও আপত্তি
২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার সময় ব্যাপক আপত্তি উঠেছিল। সেই আপত্তি মূলত পাঠ্যবইয়ের উপাদান নিয়ে ছিল। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে প্রাক্-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোনো পরীক্ষা থাকবে না। কিন্তু এখন মন্ত্রণালয় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ইতিমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ধারাবাহিক মূল্যায়নের গুরুত্ব
শিক্ষা নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা বাদ দেওয়ার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। তৃতীয় শ্রেণি থেকে পরীক্ষা চালু হবে, যেখানে ৭০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ৩০ শতাংশ চূড়ান্ত পরীক্ষা বা সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য ১০০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রস্তাব ছিল।
ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি শনাক্ত করতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় বইয়ের একটি অধ্যায় শেষ করে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে কি না, তা যাচাই করা হয়। অন্যদিকে, সামষ্টিক মূল্যায়নে বছরে এক বা দুটি চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়, যা শিখনঘাটতি দূর করার সুযোগ দেয় না।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও পরীক্ষার প্রভাব
আমাদের দেশে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফলে পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। শিশুশ্রেণিতে পরীক্ষার পক্ষে যেসব শিক্ষক যুক্তি দেখান, লক্ষ করলে দেখা যাবে, তাঁরা মূলত প্রাইভেট পড়ান বা কোচিং করান। নতুন শিক্ষা আইনের খসড়ায় এই ধরনের কোচিং ও প্রাইভেট নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন কঠিন। কারণ, অভিভাবকেরাও চান তাদের সন্তানরা বেশি নম্বর পাক।
অভিভাবকদের চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাকে প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখে। এটি তাদের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব কমিয়ে দেয়। অথচ শিক্ষার্থীদের পরস্পরকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করা উচিত।
পরীক্ষার সঠিক উদ্দেশ্য
পরীক্ষা শিক্ষার্থীর জ্ঞান বা দক্ষতা বাড়ায় না; বরং পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অবস্থা জানা যায় মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষার সঙ্গে বিদ্যালয়ের মূল্যায়নকে মিলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। ভর্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্য সেরা শিক্ষার্থী বাছাই করা, যেখানে পাস-ফেল গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্যদিকে, স্কুলের পরীক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর অবস্থা যাচাই করা এবং ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করা।
শিক্ষাবিদদের সুপারিশ
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। অন্তত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা বাদ দেওয়া উচিত। ধারাবাহিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো নম্বর রাখা যাবে না। শিক্ষার্থী নির্ধারিত দক্ষতা বা যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে কি না, সেটিই প্রধান বিবেচ্য হওয়া দরকার।
শিক্ষার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের উপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ দেওয়া হলে তারা শিক্ষাবিমুখ হয়ে উঠতে পারে। তাই সঠিক মূল্যায়ন পদ্ধতি বেছে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
