ডন জুয়ান পন্ড: মাইনাস ৫৮ ডিগ্রিতেও বরফ না হওয়া অ্যান্টার্কটিকার হ্রদ
ডন জুয়ান পন্ড: মাইনাস ৫৮ ডিগ্রিতেও বরফ না হওয়া হ্রদ

শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় পৌঁছালেই পানি জমে বরফ হতে শুরু করে। অথচ আমাদের পৃথিবীতে এমন একটি হ্রদ রয়েছে, যার পানি মাইনাস ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো চরম ঠান্ডাতেও তরল থাকে। একটুও জমে না। এই অদ্ভুত হ্রদটির নাম ডন জুয়ান পন্ড, যা অ্যান্টার্কটিকার ড্রাই ভ্যালি অঞ্চলে অবস্থিত।

লবণাক্ততার রেকর্ড

এই হ্রদের পানির ৪০ শতাংশের বেশি লবণ, যা এটিকে পৃথিবীর অন্যতম লবণাক্ত জলাশয়ে পরিণত করেছে। এই হ্রদে লবণের পরিমাণ এত বেশি যে এর পানি প্রায় সিরাপের মতো ঘন হয়ে গেছে। এই অতিরিক্ত ঘনত্বের কারণে তীব্র শীতেও হ্রদের পানি কখনো জমাট বেঁধে বরফ হয় না। যদিও ড্রাই ভ্যালি অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায়ই মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়।

আবিষ্কারের ইতিহাস

ডন জুয়ান পন্ড মাত্র ৪ ইঞ্চি বা ১০ সেন্টিমিটার গভীর। আর পুরো আয়তন প্রায় ছয়টি ফুটবল মাঠের সমান। ১৯৬১ সালে একটি অনুসন্ধান অভিযানের সময় মার্কিন নৌবাহিনীর দুজন হেলিকপ্টার পাইলট প্রথম এই হ্রদ দেখতে পান। তাঁদের নাম মিলিয়েই এই হ্রদের নাম রাখা হয় ডন জুয়ান। এই ড্রাই ভ্যালি অঞ্চলে আরও অনেক হ্রদ রয়েছে, কিন্তু কোনোটিই ডন জুয়ান পন্ডের মতো এত লবণাক্ত নয়। তাই তীব্র ঠান্ডায় সেই হ্রদগুলো বছরের বেশির ভাগ সময়ই পুরোপুরি বরফ হয়ে জমে থাকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মঙ্গল গ্রহের সঙ্গে সাদৃশ্য

নাসার বিজ্ঞানীদের কাছে ডন জুয়ান পন্ড অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি জায়গা। কারণ, অ্যান্টার্কটিকার এই ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালি অঞ্চলের চরম বৈরী আবহাওয়া অনেকটাই মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের মতো। লাল গ্রহ মঙ্গলও তীব্র ঠান্ডা ও শুষ্ক। সেখানেও বিভিন্ন ধরনের লবণ রয়েছে। গবেষকদের ধারণা সেখানে পানিও থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা ডন জুয়ান পন্ডের আশপাশে কিছু অণুজীবের বা ক্ষুদ্র জীবাণুর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। তীব্র লবণাক্ত এই পানিতেও হয়তো কিছু অতিক্ষুদ্র জীব টিকে থাকতে পারে। ড্রাই ভ্যালির মতো এমন কঠিন পরিবেশে যদি জীবন টিকে থাকতে পারে, তবে মঙ্গলের অতিলবণাক্ত অঞ্চলেও হয়তো প্রাণের অস্তিত্ব আছে, অথবা অতীতে কোনো একসময় ছিল।

লবণের রসায়ন

ডন জুয়ান পন্ডের পানিতে উচ্চ মাত্রায় ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড নামের একটি লবণ দ্রবীভূত রয়েছে। এই লবণ পানির অণুগুলোকে একে অপরের সঙ্গে জোড়া লাগতে দেয় না, যা অন্যথায় একত্র হয়ে বরফের স্ফটিক তৈরি করত। এর ফলেই হ্রদের হিমাঙ্ক অনেক কমে যায় এবং তীব্র শীতেও পানি জমে না। ডন জুয়ান পন্ডের লবণাক্ততা প্রায় ৪০ শতাংশ। আর বিখ্যাত মৃত সাগরের লবণের পরিমাণ ৩৪ শতাংশ। বোঝাই যাচ্ছে, কত বেশি লবণ আছে ডন জুয়ান পন্ডে। এমনকি আমাদের সাধারণ মহাসাগরগুলোর পানিতে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ তুলনায় এই হ্রদের পানি প্রায় ১২ গুণ বেশি লবণাক্ত।

গবেষণার ইতিহাস

বিজ্ঞানীরা ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে ডন জুয়ান পন্ড নিয়ে গবেষণা করছেন। কিন্তু এই হ্রদের পানি এবং ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড লবণ আসলে কোথা থেকে আসে, তা নিয়ে তাঁরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন। হ্রদটি আবিষ্কারের পর থেকে বিজ্ঞানীদের প্রধান ধারণা ছিল, মাটির তলার ভূগর্ভস্থ পানি ওপরে উঠে এসে ডন জুয়ান পন্ডে জল সরবরাহ করে। তবে ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ববিদেরা সম্পূর্ণ নতুন এক তথ্য জানান। তাঁদের মতে, এই পানি আসলে আসে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প থেকে। বাতাস থেকে পাওয়া সেই আর্দ্রতা মাটির লবণে আটকে যায় এবং একপর্যায়ে তা চুইয়ে নিচে নেমে আসে, যেখানে এই ডন জুয়ান পন্ড অবস্থিত।

বিতর্ক ও নতুন তথ্য

গবেষকেরা এই হ্রদ ও এর চারপাশের খাড়া ঢালের হাজার হাজার টাইম-ল্যাপস ছবি তুলেছিলেন। ছবিগুলোতে ডন জুয়ান পন্ডের কাছাকাছি কিছু কালো দাগ দেখা যায়। গবেষকদলের মতে, এগুলো ছিল ভেজা ও লবণাক্ত পলিমাটি, যা বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নিয়ে পানিকে হ্রদের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সবচেয়ে বড় চমক হলো, মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠেও ঠিক এই ধরনের কালো দাগ দেখা যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা রিকারিং স্লোপ লিনিয়ার ফিচারস বলেন। এই মিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহের বুকেও হয়তো একসময় ঠিক এ প্রক্রিয়াতেই পানি প্রবাহিত হয়েছিল।

২০১৭ সালের একটি গবেষণা আগের সেই আর্দ্রতা শোষণের ধারণাটিকে ভুল প্রমাণ করে এবং মাটির তলার পানি বা ভূগর্ভস্থ পানিব্যবস্থার তত্ত্বটিকে আবারও সামনে নিয়ে আসে। কম্পিউটার মডেল সিমুলেশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সেই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখান, ডন জুয়ান পন্ডের পানি এত বেশি লবণাক্ত হওয়ার একমাত্র উপায় এর পানির উৎসটি মাটির বেশ গভীরে থাকা কোনো ভূগর্ভস্থ পানি।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট জোনাথন টোনার এই গবেষণার প্রধান লেখক ছিলেন। ২০১৭ সালের এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যদি গভীর ভূগর্ভস্থ পানির এই ধারণা সত্য হয়, তবে আমরা এখানে যা দেখছি, তা আসলে একটি বিশাল প্রক্রিয়ার অংশ। এর মানে হলো, মাটির নিচে বেশ বড় ও বিস্তৃত একটি পানির স্তর বা অ্যাকুইফার রয়েছে। মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি কেবল একটি ছোট এলাকার সাধারণ ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। তবে সব মিলিয়ে, ডন জুয়ান পন্ডের পানির আসল উৎস ঠিক কোনটি, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক চলছে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স