ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্যের হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ভিসা ব্যবস্থার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শোষণ ও অনিয়মের একটি চিত্র সামনে এনেছে ব্রিটিশ কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনালের একটি রায়। এই ঘটনায় ভিসা প্রক্রিয়ায় সংস্কারের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। ঘটনাটি ভারতের কেরালার বাসিন্দা শাবিন শাজির (৩৩)। কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক এই যুবক কেয়ার ভিসায় যুক্তরাজ্যে গেলেও দীর্ঘ এক বছর কোনো কাজ বা আয়ের সুযোগ পাননি। এ সময় তাকে চরম আর্থিক সংকট ও অবমাননাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
আদালতের রায় ও ক্ষতিপূরণ
দীর্ঘ শুনানি শেষে বার্মিংহামের একটি আদালত স্টাফোর্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সোয়ান কেয়ার সলিউশনস লিমিটেড’-কে বকেয়া মজুরি, ছুটির অর্থ এবং আইনি খরচ বাবদ মোট ৩৭ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৫৪ পাউন্ড পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ের মাধ্যমে ব্রিটিশ আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আদালত বলেছেন, পূর্ণকালীন কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্পন্সরশিপের মাধ্যমে আনা অভিবাসী কর্মীদের কোনোভাবেই ‘জিরো-আওয়ার্স’ বা চুক্তিহীন দৈনিক মজুরি-ভিত্তিক কর্মী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এজেন্টকে ১৭ হাজার পাউন্ড
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশের তরুণ পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক নিয়োগ চক্র সক্রিয় রয়েছে। ব্রিটেনে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বা দালালদের মাধ্যমে আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট এজেন্টদের কাছে নেওয়া হয়। এই মামলায় শাবিন শাজি যুক্তরাজ্যে যাওয়ার আগে মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্টদের ১৭ হাজার পাউন্ড (প্রায় ২৫ লাখ টাকা) পরিশোধ করেন। পরে একটি নামমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাকে স্টাফোর্ডের ওই কেয়ার হোমে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়।
‘গোস্টিং’-এর শিকার
তবে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। হোম অফিস অনুমোদিত ‘সার্টিফিকেট অব স্পন্সরশিপ’ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে কোনো কাজ দেয়নি। দিনের পর দিন কোনো শিফট না দিয়ে তাকে কার্যত উপেক্ষা করা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এ ধরনের আচরণকে ‘গোস্টিং’ বলা হয়। আরও অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক সংকটে পড়া শাজিকে স্থানীয় ফুড ব্যাংক থেকে খাবার সংগ্রহ করতে এবং বেঁচে থাকার জন্য অবৈধভাবে নগদ টাকায় অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নিতে পরামর্শ দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
আইনি কাঠামোর ফাঁদ
যুক্তরাজ্যের বর্তমান ‘স্কিলড ওয়ার্কার’ ভিসা কাঠামোও তার সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেয়। হোম অফিসের নিয়ম অনুযায়ী, স্পন্সরশিপপ্রাপ্ত কোনো কর্মী মূল নিয়োগকর্তার বাইরে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারেন না। ফলে শাবিন শাজি অন্য কোথাও পূর্ণকালীন কাজও খুঁজতে পারেননি। চার্চ ও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার সহায়তায় বেঁচে থাকতে থাকতে একপর্যায়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তিনি ভারতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনালের বিচারক কেট এডমন্ডস বলেন, কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদনকারীর পক্ষ থেকে যা যা করণীয় ছিল, তার সবই তিনি সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি বৈধ অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নিয়োগকর্তা তাকে কাজ বা পারিশ্রমিক কোনোটিই দেয়নি, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। রায়ে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী কাজের পরিবেশ না দিয়ে তাকে জিরো-আওয়ার্স কর্মীর মতো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি শ্রমিকের মজুরি অবৈধভাবে আটকে রাখার শামিল।
ভুয়া চিঠির অভিযোগ খারিজ
আদালতের নথি অনুযায়ী, শুনানির সময় সোয়ান কেয়ার সলিউশনস দাবি করেছিল, তারা আগেই শাজির চাকরির প্রস্তাব বাতিল করেছিল। এ দাবির পক্ষে প্রতিষ্ঠানটি একটি পুরোনো তারিখের চিঠিও উপস্থাপন করে। তবে জেরার সময় প্রতিষ্ঠানটি হোম অফিসে এ–সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রমাণ বা ডাকযোগে পাঠানোর রসিদ দেখাতে পারেনি। ফলে ট্রাইব্যুনাল তাদের দাবি সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেন।
এদিকে শাবিন শাজি অসুস্থ হয়ে কেরালায় ফিরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া তার আইনজীবীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তার আইনি প্রতিনিধি শর্মিলা বোস লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে বিশেষ কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে দূরবর্তী ভিডিও সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমতি নেন।
রায়ে আরও বলা হয়, কর্মসংস্থানসংক্রান্ত লিখিত বিবরণী বা চুক্তিপত্র না দিয়ে নিয়োগকর্তা গুরুতরভাবে সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছেন। এ কারণে বিচারক প্রচলিত যুক্তরাজ্যের শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ আর্থিক জরিমানা আরোপ করেন।
সংকটে হাজারো বাংলাদেশি
এই মামলাটি কেয়ার খাতে প্রথম সফল আইনি প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও পর্যবেক্ষণ বলছে, এটি বৃহত্তর একটি কাঠামোগত সংকটের অংশ মাত্র। বিভিন্ন মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার সংগঠনের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন এই ভিসা চালুর পর থেকে হাজার হাজার অভিবাসী কর্মী যুক্তরাজ্যের কেয়ার সেক্টরে এসে একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ভুক্তভোগীর বড় একটি অংশ বাংলাদেশের নাগরিক। তথাকথিত ‘সরাসরি কেয়ারার ভিসা’র প্রলোভনে কোটি টাকা ব্যয় করে যুক্তরাজ্যে যাওয়া হাজার হাজার বাংলাদেশি কেয়ারকর্মী প্রথম দিন থেকেই কাজ না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। আইনি বাধ্যবাধকতা এবং স্পন্সরশিপ বাতিলের আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে পারেন না।
নীতিনির্ধারণে প্রভাব
এই রায়ের প্রভাব ইতিমধ্যে হোম অফিস এবং শ্রম শোষণবিরোধী কর্তৃপক্ষের নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। কেয়ার সেক্টরের নিয়োগ নেটওয়ার্ক নিয়ে সমন্বিত তদন্ত শুরু হয়েছে। একই মডেলে পরিচালিত শত শত ছোট কেয়ার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এরই মধ্যে সোয়ান কেয়ার সলিউশনস লিমিটেডের স্পন্সরশিপ লাইসেন্স বাতিল করেছে হোম অফিস।



