জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে বছরব্যাপী বই পড়া কার্যক্রমের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আজ সোমবার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি লাইব্রেরির ১৪৫ জন পাঠক-শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করা হয়।
পুরস্কার ও বিজয়ী নির্বাচন
সেরা ২০ জন শিক্ষার্থীকে ৩ হাজার টাকার বই, ৩ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড এবং সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া বাকি ১২৫ জন শিক্ষার্থীকে ১ হাজার টাকার বই, ১ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড ও সার্টিফিকেট দিয়ে উৎসাহিত করা হয়।
আয়োজকেরা জানান, এবারের কার্যক্রমে দেশের ৭২টি বেসরকারি লাইব্রেরির ৬৪৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী দুটি গ্রুপে ভাগ করে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য হুমায়ূন আহমেদের সায়েন্স ফিকশন ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য জহির রায়হানের উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ পড়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। বই পড়ার পর তাঁদের কাছ থেকে রিভিউ বা লিখিত মতামত নেওয়া হয়।
লিখিত খাতার ভিত্তিতে সেরা ১৪৫ জনকে বাছাই করা হয়। এরপর ৮, ৯ ও ১০ জুন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। বিচারকদের নম্বরের ভিত্তিতে দুই গ্রুপ থেকে সেরা ১০ জন করে মোট ২০ জনকে চূড়ান্ত বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রীর বক্তব্য
প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘ ১৮ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে দেশপ্রেমিক নাগরিক ও তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম ফেসবুকের মাধ্যমে সুগভীর যোগাযোগ তৈরি করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। প্রথমে তারা পরিবর্তন চাইলেও পরে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি ও বণ্টনব্যবস্থার রূপান্তরের দাবিতে বুক পেতে গুলি নিয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে মানুষ হত্যার পরও ঢাকার সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসায় এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে।’ তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে গবেষকদের আরও গবেষণার আহ্বান জানান।
দেশ গঠনে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের মূল অগ্রাধিকার হলো দেশ থেকে দুর্নীতি ও মাদক সম্পূর্ণ নির্মূল করা।’
আলোচনা ও সভাপতির বক্তব্য
অনুষ্ঠানে লেখক ও অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক হুমায়ূন আহমেদের ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ বইটির মূল ভাব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এটি কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নয়, বরং পৃথিবীর প্রতি বিজ্ঞানী ফিহার আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রেমের গল্প। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘যন্ত্র মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষ যন্ত্রের জন্য নয়।’
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম বলেন, ‘তরুণদের পাঠকসত্তাকে জাগিয়ে তোলাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।’ তিনি জানান, সরকারের জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়িত হলে দেশব্যাপী পাঠচক্র, প্রশিক্ষণ ও বইমেলার পরিধি আরও বাড়বে।
সভাপতি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা জেন-জিদের বইমুখী করতে যুগোপযোগী বই নির্বাচনের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান জেন-জি প্রজন্মের রুচি ও চিন্তাভাবনা আলাদা। তাই তাদের বইমুখী করতে জোর করে পুরোনো বই না চাপিয়ে, তাদের উপযোগী বই উপস্থাপন করতে হবে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন ঢাকাস্থ সীমান্ত গ্রন্থাগারের পাঠক-শিক্ষার্থীরা। দলীয় আবৃত্তি করেন ঢাকাস্থ কামাল স্মৃতি পাঠাগারের পাঠক-শিক্ষার্থীরা। বিচারকদের মধ্যে ছিলেন লেখক ও অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী, লেখক ও সংগঠক সাবিদিন ইব্রাহিম।



