বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অবশেষে সেই বৈষম্য দূর করতে দেশের সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছেন, এক বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ যৌক্তিক নয়। কোনো একটি বোর্ড প্রশ্ন সহজ করতে পারে, আবার অন্য কোনো বোর্ড তুলনামূলক কঠিন প্রশ্ন করতে পারে; ফলে একই দেশের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে বৈষম্য তৈরি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ও লেভেল এবং এ লেভেল পরীক্ষার উদাহরণও তিনি তুলে ধরেছেন, যেখানে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়।
বৈষম্য দূরীকরণ ও উচ্চশিক্ষায় প্রভাব
বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডগুলো দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে আসছে; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বিভিন্ন বোর্ডের প্রশ্নপত্রের কাঠিন্য ও মানে পার্থক্যের কারণে ফলাফলেও বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কোনো বোর্ডে প্রশ্নপত্র তুলনামূলক সহজ হওয়ায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বেড়েছে, আবার অন্য কোনো বোর্ডে কঠিন প্রশ্নপত্রের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ ফল করেছে। এর ফলে একই মেধা ও পরিশ্রম থাকা সত্ত্বেও বোর্ড ভেদে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে পার্থক্য দেখা দিয়েছে।
এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে। মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার সময় বিভিন্ন বোর্ডের শিক্ষার্থীদের একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়; কিন্তু পাবলিক পরীক্ষায় তাদের মূল্যায়নের ভিত্তি যদি এক না হয়, তাহলে সেখানে একটি অদৃশ্য বৈষম্য থেকেই যায়। যে শিক্ষার্থী কঠিন প্রশ্নপত্রের কারণে তুলনামূলক কম জিপিএ পেয়েছে, সে প্রকৃত অর্থে অন্য কোনো বোর্ডের উচ্চ জিপিএধারী শিক্ষার্থীর চেয়ে কম মেধাবী না–ও হতে পারে। অভিন্ন প্রশ্নপত্র এ ধরনের অসামঞ্জস্য দূর করার একটি বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে।
পূর্ববর্তী উদ্যোগ ও ফলাফলের পার্থক্য
অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০১৮ সালেও দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। সে সময় শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ফলাফলের পার্থক্য কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেছিলেন, অভিন্ন প্রশ্নপত্র মূল্যায়নে জবাবদিহি সৃষ্টি করবে এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করবে। তৎকালীন বাস্তবতাও এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক বছরে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি ইংরেজি বিষয়ে প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছিল; অথচ একই সময়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। সিলেবাস যখন সবার জন্য একই, তখন প্রশ্নপত্রের পার্থক্যের কারণে এমন বিশাল ফলগত ব্যবধান শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অবশ্যই উদ্বেগজনক। এটি শুধু ফলাফলের পার্থক্য নয়; বরং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের ওপরও প্রভাব ফেলে।
সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো যায়। এতে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা একই মানদণ্ডে মূল্যায়িত হবে। কোনো বোর্ড সহজ প্রশ্নপত্র করে কৃত্রিমভাবে ফল উন্নত করতে পারবে না, আবার কোনো বোর্ড অতিরিক্ত কঠিন প্রশ্নপত্র দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্তও করতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিভিন্ন বোর্ডের ফলাফলকে অধিকতর বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে পারবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় একটি জাতীয় মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে এই ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা বছরের শুরু থেকেই নিজ নিজ বোর্ডের প্রশ্নধারা, পূর্ববর্তী প্রশ্নপত্র এবং মূল্যায়নপদ্ধতি অনুসরণ করে প্রস্তুতি নেয়। অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দীর্ঘ সময় ধরে বোর্ডভিত্তিক প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে পরীক্ষার কৌশল নির্ধারণ করে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার অল্প সময় আগে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ঘোষণা অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সে বিবেচনায় সিদ্ধান্তটি আরও আগে ঘোষণা করা যেত। এমনকি এটি আগামী শিক্ষাবর্ষ বা পরবর্তী ব্যাচ থেকে কার্যকর করা হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করার সুযোগ পেত।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি। ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। তখন প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এক পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল।
বাস্তবতা হলো যখন একটি প্রশ্নপত্র সারা দেশের লাখো শিক্ষার্থীর জন্য প্রযোজ্য হয়, তখন সেই একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে ক্ষতির পরিমাণও বহু গুণ বেড়ে যায়। আলাদা বোর্ডের ক্ষেত্রে একটি অঞ্চলের সমস্যা সীমিত পরিসরে প্রভাব ফেলতে পারে; কিন্তু অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে তা মুহূর্তেই জাতীয় সংকটে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে অতীতে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা ও নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বহুবার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কোথাও মূল প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্রের সেট, গাইড বই, ফটোকপি মেশিন ও মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে। আবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার মতো ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং অসাধু চক্রের তৎপরতা যেকোনো ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে।
বর্তমান সময়ে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম কিংবা অন্যান্য এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোনো তথ্য দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থা চালুর আগে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে।
প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশ্নপত্র পরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকিং–ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার আগে ও চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী সাইবার মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র ফাঁস বা গুজব দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত সচেতনতাও অপরিহার্য।
আশার কথা হলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাবলিক পরীক্ষার নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষাও তুলনামূলক সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বড় ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠেনি। সেশনজট কমাতে সিলেবাস শেষ হওয়ার পর দ্রুত পরীক্ষা গ্রহণ এবং এক বছর আগে পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশের উদ্যোগও শিক্ষাব্যবস্থায় পরিকল্পিত সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, অভিন্ন প্রশ্নপত্রের উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর—যথাযথ প্রস্তুতি এবং প্রশ্নপত্রের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিঃসন্দেহে এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য প্রশংসনীয়, কারণ, শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো শিক্ষার্থী এবং পরীক্ষা হলো শিক্ষার্থী মূল্যায়নের একটি প্রধান উপাদান। সুতরাং পরীক্ষাসংক্রান্ত যেকোনো পরিবর্তনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত—তাদের জন্য একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বস্তিদায়ক মূল্যায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
লেখক: শুভাশীষ দাশ, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি, সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, ফেনী



