দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চামড়াশিল্প এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ আবর্তিত হতো, তা এখন প্রায় পঙ্গুত্বের পর্যায়ে চলে এসেছে। তীব্র মূলধন সংকট, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং নানা কারণে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ঈদের মাত্র দুই দিন আগেও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
চামড়ার বাজারে ধসের পাঁচ কারণ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং চামড়াশিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে চরম ধস নামার আশঙ্কার পেছনে পাঁচটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো: তীব্র তারল্য ও ব্যাংক ঋণ সংকট, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর (বিসিক) ব্যর্থতা, লবণ ও কেমিক্যালের দাম বেড়ে যাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতা।
ব্যাংক ঋণের গোলকধাঁধায় ট্যানারি মালিকরা
প্রতিবছর কুরবানির আগে চামড়া কেনার জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু সিংহভাগ ট্যানারি মালিক এই ঋণ পান না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাত দেখিয়ে টাকা দেয় না। সাভারে স্থানান্তরের পর থেকে অধিকাংশ ট্যানারি লোকসানে চলছে। আড়তদাররা টাকা না পেলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনে না, ফলে বাজার অস্থির হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, এ বছর চামড়া সংরক্ষণে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২৮ কোটি টাকা, তবে শেষ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটির নিচে নেমে আসবে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার আন্তর্জাতিক চক্রান্ত
চামড়াশিল্পের এই ধ্বংসাত্মক দশাকে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে নারাজ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এর মূল উদ্দেশ্য দেশের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। ঢাকা দক্ষিণখানের দারুল আবরার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা আবদুল হান্নান বলেন, চামড়াজাত পণ্যের দাম প্রতিবছর বাড়লেও বিপরীতে কুরবানির চামড়ার দাম কমছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশে এটা হয় কিনা আমার জানা নেই। অবশ্যই এর পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও কারসাজি রয়েছে। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, কুরবানির চামড়া বা তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিজে ভোগ করা যায় না, এটি দরিদ্র, এতিম, মিসকিন এবং লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের হক। অথচ এতিমদের এই হক মাটি করে দেওয়া হয়েছে।
অনেকে বলছেন, দেশে চামড়ার দাম তলানিতে নামার পেছনে ভারতের একটি বড় হাত রয়েছে। বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার দাম কম থাকলে তা অবৈধ পথে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পাচার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া খাত যাতে ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারে, সেজন্যও একটি আন্তর্জাতিক লবিং সক্রিয় রয়েছে।
খিলগাঁও গোড়ান বাজারে জামেয়া ইসলামিয়া ফজলুর রহমান ভূঁইয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার ইনচার্জ মাওলানা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, মাদ্রাসার ছেলেগুলো এখন আর চামড়া সংগ্রহ করতে যেতে চায় না। অনেক এতিমখানায় চামড়া সংগ্রহ করা হয় না। এটি মাদ্রাসা শিক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এতিম ও কওমি মাদ্রাসা
দেশের কওমি মাদ্রাসা, দারুল উলুম মাদ্রাসা এবং এতিমখানাগুলো তাদের বার্ষিক বাজেটের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পায় কুরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। মাদ্রাসা পরিচালনাকারী ওলামাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। চামড়ার টাকা দিয়ে সারা বছর হাজার হাজার এতিম ও দুস্থ শিশুর তিন বেলার খাবার ও চিকিৎসার খরচ চালানো হয়। এই খাত বন্ধ হওয়ায় অনেক মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি
চামড়া খাতের সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী তৎপরতা ও কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে কেউ চামড়া নিয়ে কারসাজি করতে না পারে। চামড়া পাচার রোধে বিজিবির নজরদারি জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে।



