এমপিও শিক্ষকদের অবসর ভাতা সংকট: স্থায়ী সমাধান জরুরি
এমপিও শিক্ষকদের অবসর ভাতা সংকট: স্থায়ী সমাধান জরুরি

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য নিয়মিত মাসিক পেনশনের ব্যবস্থা নেই। অবসরে যাওয়ার পর তাঁরা এককালীন অবসর ভাতা ও কল্যাণ ভাতা পেয়ে থাকেন। এই ভাতা পাওয়ার জন্য তাঁদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। নিজের টাকা পাওয়ার আগে মারা যান কেউ কেউ। শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাতা প্রাপ্তির সমস্যা নিয়ে কিছুদিন আগে প্রথম আলোয় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি পর্যালোচনা করে এবং নতুন অর্থবছরে দুই হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই বরাদ্দের কারণে সংকট নিশ্চয় খানিকটা কমবে; কিন্তু সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন, এভাবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে না।

অপেক্ষার প্রহর গুনছেন ৬৪ হাজার শিক্ষক

সারা দেশে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী, অবসর সুবিধার জন্য অপেক্ষায় আছেন প্রায় ৬৪ হাজার। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে কোনো আবেদনকারী টাকা পাননি। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার বছরের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর থেকে এ পর্যন্ত আবেদনকারীরা কল্যাণ সুবিধার টাকাও পাননি। এখানেও তিন বছরের বেশি ঘাটতি। কল্যাণ সুবিধার প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। সুতরাং সহজেই অনুমান করা যায়, অবসরে যাওয়ার পর শিক্ষক-কর্মচারীদের হয় নিজের জমানো টাকা ভেঙে খেতে হচ্ছে, নইলে অন্যদের কাছে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। অথচ প্রাপ্য টাকার মূল অংশ তাঁদের বেতন থেকেই কেটে রাখা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেতন থেকে কাটা টাকার অপ্রতুলতা

অবসর সুবিধার জন্য প্রতি মাসে মূল বেতনের ৬ শতাংশ কেটে রাখা হয়; কল্যাণ সুবিধার জন্য কাটা হয় আরও ৪ শতাংশ। তবে এই হিসাব রাখার জন্য কোনো ডেটাবেজ নেই; থাকলে একজন শিক্ষক বা কর্মচারী যেকোনো সময়ে জানতে পারতেন, কোন খাতে তাঁর কত টাকা জমা আছে। এমনকি ডেটাবেজ থাকলে চাকরিকালে তাঁরা নিজের জমা টাকা থেকে স্বল্প সুদে বা সুদবিহীন ঋণও নিতে পারতেন। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিবছর ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়; এর ৭০ টাকা অবসরের জন্য এবং বাকি ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য আলাদা রাখার কথা। অবসর বোর্ড বলছে, ৬ শতাংশ হারে টাকা কাটার ফলে প্রতি মাসে অবসর তহবিলে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা জমা হয়। এফডিআরের লভ্যাংশ আসে আরও প্রায় তিন কোটি টাকা। অথচ আবেদন মেটাতে মাসে তাদের প্রয়োজন হয় গড়ে ১২৫ কোটি টাকা। বর্তমানে জমে থাকা আবেদন অনুযায়ী অবসর সুবিধা খাতে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, আর কল্যাণ ট্রাস্টে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিজের টাকা পেতেও বেগ পেতে হয়

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সীমিত বেতন-ভাতা নিয়ে তাঁদের চাকরিজীবন পার করেন। অবসরে এসেও যদি তাঁদের নিজেদের টাকা তোলার জন্য বেগ পেতে হয়, তবে তা বেদনাদায়ক হবে। এই বাস্তবতায় শিক্ষক-কর্মচারীদের অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে। অবসরকালে যেহেতু নিয়মিত বেতন-ভাতা থাকে না, ফলে এ সময়ে তাঁদের চলতে সমস্যা হয় সবচেয়ে বেশি। এককালীন একটি বড় অঙ্কের টাকা প্রাপ্তির মাধ্যমে তাঁরা খানিকটা স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজ করেন। এখন নিজেদের টাকা পেতেও যদি তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়, তবে এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে! বিদ্যমান অবস্থা-ব্যবস্থায় তাঁদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অনেকেই মনে করেন, নিজের টাকা নিজে জমিয়ে রাখলে অন্তত এত দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।

ভুক্তভোগীর মন্তব্য

একজন ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, ‘স্বাধীনতার এত বছরে কত পরিবর্তন হলো—কাঁচা রাস্তা পাকা হলো, শতভাগ বিদ্যুতায়ন হলো, বাজেট কয়েক শ গুণ বৃদ্ধি পেল, পাকা রাস্তায় উড়ালসড়ক হলো, নদীর তলে টানেল হলো, আকাশে স্যাটেলাইট উঠল, বড়রা বিদেশে সেকেন্ড হোম গড়ল; অপর দিকে অবসরের পর কত শিক্ষক অবসরকালীন সুবিধা না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেল, দালালের খপ্পরে পড়ে কতজন নিঃস্ব হলো, বোর্ডের দরজায় হাঁটতে হাঁটতে জুতা ক্ষয়ে গেল; কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ সুবিধার বিধির কোনো পরিবর্তন হলো না।’

আদালতের নির্দেশনা ও সরকারের উদ্যোগ

শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধার টাকা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এর আগে ২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন থেকে ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ৪ শতাংশ টাকা কাটার পরিপত্র জারি করা হয়। তখন এই আদেশের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। অতিরিক্ত টাকা কাটার নির্দেশনা দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপনকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁরা রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন।

পুরনো বিধি ও বর্তমান সংকট

১৯৯৯ সালের কল্যাণ ট্রাস্টের প্রবিধান এবং ২০০৫ সালের অবসর সুবিধার প্রবিধান অনুযায়ী শিক্ষক ও কর্মচারীদের মূল বেতনের ৪ শতাংশ এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ২ শতাংশ হারে টাকা কাটার বিধান ছিল। কিন্তু মোট ৬ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ কাটার বিপরীতে বাড়তি আর্থিক সুবিধা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে ওই সময়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবসরের আর্থিক সুবিধা কেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেওয়া হবে না, তা–ও জানতে চাওয়া হয় রুলে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে যে টাকা কাটা হয়, তার বিপরীতে সরকার কোনো টাকা জমা করে না।

প্রতিষ্ঠান দুটির দুর্বলতা

অবসর ও কল্যাণ সুবিধা পরিচালিত হয় দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। অবসর সুবিধার টাকা দেয় ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড’; আর কল্যাণ সুবিধার টাকা দেয় ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’। প্রতিষ্ঠান দুটি আবার পরিচালিত হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘ সময় ধরে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা বোর্ড ছিল না। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত ওয়েবসাইট ও অনলাইন যোগাযোগের সব তথ্য হালনাগাদ ও কার্যকর করা হয়নি। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বা কর্মচারী যাতে সহজে যোগাযোগ করতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে দ্রুততম সময়ে তাঁর প্রাপ্য টাকা পেতে পারেন, সেই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

স্থায়ী সমাধানের পথ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংকট কমানোর জন্য ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বন্ড দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা অবসর সুবিধার জন্য এবং ২০০ কোটি টাকা কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য। এই বন্ডের মুনাফা ছয় মাস পরপর পাওয়া যাওয়ার কথা, যার পরিমাণ ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা। নতুন সরকারও প্রায় একই পদ্ধতিতে থোক বরাদ্দ দিয়ে সংকট কমানোর চিন্তা করছে। কিন্তু সরকারের জানা থাকার কথা, কোন বছরে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কত জন অবসরে যাচ্ছেন। সুতরাং সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য এই খাতে প্রতিবছর শিক্ষা বাজেট থেকে প্রয়োজনীয় অংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতেই হবে।

• তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক