কারিগরি শিক্ষায় সংকট: ৭৩% শিক্ষক পদ শূন্য, ৪৪% শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে
কারিগরি শিক্ষায় সংকট: ৭৩% শিক্ষক পদ শূন্য, ৪৪% ঝরে পড়া

কারিগরি শিক্ষায় মারাত্মক সংকট: শিক্ষক পদ শূন্য ৭৩%, ঝরে পড়ার হার ৪৪%

দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে গভীর সংকট বিরাজ করছে। শিক্ষক সংকট, পুরোনো ও অনুন্নত কারিকুলাম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং উপকরণের অভাব এই খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বাংলাদেশে ১২ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হলেও এর মান ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে।

শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনকভাবে ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বিভিন্ন পলিটেকনিক, মনোটেকনিক এবং কারিগরি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক পদের ৭৩ শতাংশই শূন্য অবস্থায় রয়েছে। জনশক্তি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যুরোর অধীন কারিগরি প্রতিষ্ঠানেও প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য আছে।

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এক শিফটের শিক্ষক দিয়ে দুই শিফট চালানো হচ্ছে, যা শিক্ষার মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি সংকট দেখা দিয়েছে, আবার ল্যাব থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরো নাজুক। ৩৮৭টি বেসরকারি পলিটেকনিকের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি ছাড়া অন্যগুলো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হ্রাস ও উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ

উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং বেতন কমের কারণে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিনদিন কমছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ল্যাবরেটরি ও শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী নয়। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা পাচ্ছেন না, দক্ষ শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম। আবার বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারছে না দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা। সনাতন শিক্ষার কারণে আন্তর্জাতিক স্তরে সমমর্যদা পাচ্ছে না বাংলাদেশের ডিপ্লোমা।

আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্তির আহ্বান

শিক্ষাবিদরা ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেনস, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ব্লকচেইন টেকনোলজিসহ আধুনিক বিষয়গুলো কারিগরি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়নে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মন্ত্রীর নির্দেশ ও সংস্কারের উদ্যোগ

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে একটি দক্ষ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে প্রকৃত মানবসম্পদে রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই। দেশের ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য বদলাতে কারিগরি শিক্ষাই হবে প্রধান চাবিকাঠি।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে ক্রেডিট ব্রিজ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স তৈরি হবে।

গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র

এক গবেষণায় দেখা গেছে, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছেন, যাদের মধ্যে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন শতকরা ৭২ শতাংশ। বাকি প্রায় ২৮ শতাংশ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার আগে ঝরে পড়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশে চাকরি না পেয়ে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ দিনদিন হারিয়ে ফেলছেন শিক্ষার্থীরা।

জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাপনা একাডেমিতে (নায়েম) ২০২১ সালে জমা দেওয়া এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ কর্মজীবী, ৪ শতাংশ উদ্যোক্তা, ৩৮ শতাংশ বেকার ও ৪ শতাংশ কাজে আগ্রহী নন। তবে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেকারত্বের হার বেশি। গ্রামাঞ্চলের মাত্র ৪৮ শতাংশ ডিপ্লোমাধারী কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন।

শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্য

দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বৈদেশিক আয়। কোটি প্রবাসীর হাত ঘুরে আসছে এ রেমিট্যান্স। অর্ধেকের বেশি শ্রমিক যাচ্ছেন অদক্ষ হিসেবে। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। শিক্ষাবিদরা বলেন, দেশে কারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো সম্প্রসারণ হয়েছে কিন্তু শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা বাড়ানো খুবই জরুরি।

কারিগরি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোয় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রি-ভোকেশনাল এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কমপক্ষে চারটি করে ট্রেডে পড়াশোনা করানো হয়। এছাড়া, এসএসসি (ভোকেশনাল) ও এইচএসসি (ভোকেশনাল) কোর্সসহ বিভিন্ন ট্রেডের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে সব কোর্স চালু আছে, এমন প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ আসন ফাঁকা থাকছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা

১০০টি উপজেলায় একটি করে টিএসসি নির্মাণের প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০১৪ সালে। ঐ সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯২৪ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে এসব টিএসসি নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের সিকিভাগও বাস্তবায়িত না হওয়ায় বাড়ানো হয় বরাদ্দের পরিমাণ ও মেয়াদ। দুই বছর মেয়াদের সে প্রকল্প ২০২৬ সালে এসেও শেষ হয়নি।

পাঁচ বছরের হতাশাব্যঞ্জক পরিসংখ্যান

বিগত পাঁচ বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মোট শিক্ষার্থী ভর্তি হন ৮১ হাজার ৭৬ জন। ঐ শিক্ষাবর্ষে আসন ফাঁকা ছিল ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। তার পরের শিক্ষাবর্ষে ৭৭ হাজার ২৭২ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ৫৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ ছিল শূন্য আসন।

এছাড়া ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ছিল ৭৩ হাজার ২৭২ জন, ফাঁকা আসন ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ; ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন ৭১ হাজার ৫৫৩ শিক্ষার্থী, আর ফাঁকা পড়ে ছিল ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ আসন। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষার্থীর পরিমাণ দিনদিন কমছে, যা দেশের দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।