রহস্যময় বস্তু টিওআই-২১৫৫বি: নক্ষত্র নাকি ব্যর্থ নক্ষত্র, বিজ্ঞানীরা দ্বিধায়
টিওআই-২১৫৫বি: নক্ষত্র নাকি ব্যর্থ নক্ষত্র, বিজ্ঞানীরা দ্বিধায়

পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ আলোকবর্ষ দূরের এক নক্ষত্রজগৎ। সেখানে জ্বলজ্বল করছে টিওআই-২১৫৫ নামে একটি নক্ষত্র। সূর্যের চেয়ে এটি আকারে বেশ বড়, ভারী এবং গরমও বেশি। তবে এই নক্ষত্রটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে অন্য একটি জিনিস, যা এই নক্ষত্রটির চারপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

জিনিসটার নাম দেওয়া হয়েছে টিওআই-২১৫৫বি। মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা সরাসরি এই জিনিসটাকে দেখতে পাননি। যখন এই ছোট বস্তুটি তার মাতৃনক্ষত্রের সামনে দিয়ে পার হয়, তখন নক্ষত্রের আলো সামান্য একটু কমে যায়। আলোর এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন মেপেই বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। এটি আসলে কী? কোনো ছোট্ট নক্ষত্র, নাকি বিশাল কোনো গ্রহ? নাকি গ্রহ ও নক্ষত্রের মাঝামাঝি অদ্ভুত কোনো বস্তু? বিজ্ঞানীরা ঠিক এই জায়গায় এসেই হোঁচট খেয়েছেন!

রহস্যের সীমানায় টিওআই-২১৫৫বি

সম্প্রতি দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই বস্তুটা আসলে কী, তা তারা এখনো নিশ্চিত নন। এটি এমন এক অদ্ভুত সীমারেখায় বসে আছে, যাকে পুরোপুরি নক্ষত্রও বলা যাচ্ছে না, আবার বাতিলও করা যাচ্ছে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আপনি হয়তো ভাবছেন, একটি নক্ষত্র আসলে কীভাবে তৈরি হয়? মহাশূন্যে ভাসতে থাকা বিশাল সব গ্যাসের পিণ্ড থেকেই নক্ষত্রের জন্ম। কিন্তু সেই পিণ্ডটিকে ঠিক কতটা বড় বা ভারী হতে হবে? শুনতে খুব সহজ মনে হলেও, দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই একটি প্রশ্নেরই নিখুঁত উত্তর খুঁজছেন।

একটি নক্ষত্রের ভেতরে প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় চাপ থাকতে হয়। এই চাপের ফলে ভেতরের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো ফিউশন প্রক্রিয়ায় হিলিয়ামে পরিণত হয়। এই ফিউশন চলতে হয় একটানা অনেক দিন। এই প্রক্রিয়ার ফলেই তৈরি হয় প্রচণ্ড তাপ ও আলো, যা দেখে আমরা দূর থেকে বুঝতে পারি, ওটা একটা জ্বলজ্বলে নক্ষত্র।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যর্থ নক্ষত্র: ব্রাউন ডোয়ার্ফ

কিন্তু যদি কোনো গ্যাসের পিণ্ড আকারে খুব বেশি বড় না হয়? যদি তার ভেতরে ফিউশন ঘটানোর মতো পর্যাপ্ত মহাকর্ষীয় চাপ তৈরি না থাকে? অথবা অন্য কোনো কারণে ফিউশন প্রক্রিয়া যদি ঠিকমতো শুরু হতে না পারে? তখন সেই গ্যাসপিণ্ডটি পরিণত হয় একধরনের ব্যর্থ নক্ষত্রে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা বাদামি বামন। জন্মের শুরুর দিকে এরা বেশ গরম থাকে ঠিকই, কিন্তু একটানা হাইড্রোজেন ফিউশন না হওয়ার কারণে এরা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকে। তখন এদের শরীর থেকে কেবল টিমটিমে ইনফ্রারেড আলো বের হয়।

ঠিক কোন ওজনের পর একটি গ্যাসপিণ্ড নক্ষত্র হবে, আর কোন ওজনের নিচে থাকলে সেটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ হবে; অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এমন কিছু বস্তুর খোঁজ করেন, যারা ঠিক সীমানায় বসে আছে। অর্থাৎ সবচেয়ে ভারী ব্রাউন ডোয়ার্ফ এবং সবচেয়ে হালকা নক্ষত্রের মাঝামাঝি জোনটাতেই তাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।

টিওআই-২১৫৫বি: পরিমাপ ও রহস্য

ঠিক এই জায়গাতেই মঞ্চে প্রবেশ করেছে আমাদের সেই রহস্যময় টিওআই-২১৫৫বি! নাসার টেস স্যাটেলাইট এবং পৃথিবীর বিভিন্ন গ্রাউন্ড-বেজড টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এর আকার ও ভর নিখুঁতভাবে মেপেছেন। পরিমাপে দেখা গেছে, এটি দেখতে প্রায় আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতি গ্রহের সমান। কিন্তু চমকে যাওয়ার মতো তথ্য হলো, এর ভর বৃহস্পতির চেয়ে প্রায় ৮০ গুণ বেশি। একদম নিখুঁতভাবে বললে ৮০.৬ গুণ!

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সাধারণত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, কোনো বস্তুর ভর যদি বৃহস্পতির ভরের ৭৫ থেকে ৮০ গুণ হয়, তবেই সেটি নক্ষত্র হিসেবে জ্বলে ওঠার জন্য উপযুক্ত। হয়তো ভাবছেন, একটা নির্দিষ্ট ওজনে পৌঁছালেই জিনিসটা ম্যাজিকের মতো নক্ষত্র হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব জগৎ তো আর এত সহজ অঙ্ক মেনে চলে না! আধুনিক তাত্ত্বিক মডেলগুলো বলছে, শুধু ভর থাকলেই হবে না; একটি বস্তু নক্ষত্র হবে নাকি ব্রাউন ডোয়ার্ফ হবে, তা নির্ভর করে তার বয়স, রাসায়নিক গঠন এবং বায়ুমণ্ডলের নানা বৈশিষ্ট্যের ওপর। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা আজও একমত হতে পারেননি যে, ঠিক কোন সীমারেখায় একটি গ্রহ বা ব্রাউন ডোয়ার্ফ পুরোপুরি নক্ষত্রে পরিণত হয়।

ভবিষ্যৎ গবেষণার দিগন্ত

মহাকাশে আবিষ্কৃত টিওআই-২১৫৫বি হয়তো এযাবৎকালের সবচেয়ে ভারী ব্রাউন ডোয়ার্ফ, অথবা সবচেয়ে হালকা নক্ষত্র। ভরের এই ট্রানজিশন জোনে বা সীমানায় থাকা এমন বস্তু মহাকাশে খুবই বিরল। মহাকাশবিজ্ঞানে অনেক সময়ই সবচেয়ে বিরল জিনিসগুলো থেকেই সবচেয়ে বড় রহস্যের জট খোলে। তবে শুধু একটি বস্তু দিয়ে এই বিশাল রহস্যের সমাধান হবে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে মহাকাশের এই সীমানায় থাকা এমন আরও বস্তুর খোঁজ মিললে, হয়তো আমরা বুঝতে পারব ঠিক কোন জাদুকরী শর্ত পূরণ হলে কোটি কোটি বছরের জন্য একটি নক্ষত্র জ্বলে ওঠে!

সূত্র: দ্য কনভার্সেশন