ল অব এভারেজের গাণিতিক রহস্য: লটারি বা কয়েন টসে ভাগ্য কেন সমান হয় না?
ল অব এভারেজের রহস্য: লটারি বা কয়েন টসে ভাগ্য সমান হয় না কেন?

ল অব এভারেজের গাণিতিক রহস্য: লটারি বা কয়েন টসে ভাগ্য কেন সমান হয় না?

ল অব এভারেজ বা গড়পড়তার সূত্রের নাম শুনেছেন? লোকমুখে প্রচলিত এই বিশ্বাসের মূল কথা হলো, র‍্যান্ডম ঘটনাগুলো দীর্ঘমেয়াদে কাটাকাটি হয়ে সমান হয়ে যায়। ধরুন, লটারিতে একটা নির্দিষ্ট নম্বর অনেকদিন ধরে উঠছে না। তখন অনেকেই ভাবেন, এই নম্বরটার এবার ওঠার সময় হয়েছে, কারণ অনেকদিন এটা ওঠেনি। কিন্তু গণিতের দৃষ্টিতে এই ধারণা কতটা সঠিক? চলুন গভীরে যাওয়া যাক।

কয়েন টসের উদাহরণ: অতীত কি ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে?

ধরুন, আমি একটা নিখুঁত কয়েন দিয়ে টস করছি। এর হেড (H) বা টেল (T) পড়ার সম্ভাবনা সমান। কতবার হেড পড়ল আর কতবার টেল, তা খাতায় লিখে রাখছি। হঠাৎ দেখা গেল, হেড পড়ার সংখ্যা টেলের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। ধরুন, টেলের চেয়ে হেড ১০০ বার বেশি পড়েছে। এখন পরের টসগুলোতে কি টেল পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে?

অনেকে মনে করেন, টেল পড়ার সম্ভাবনা এখন বেড়ে যাবে। তাঁরা ভাবেন, প্রকৃতির একটা নিয়ম আছে। প্রকৃতি সবকিছু সমান করে দেওয়ার চেষ্টা করে। আবার অনেকে বলেন, ‘কয়েনের কি আর স্মৃতি আছে? ও কি মনে রেখেছে যে আগে ১০০ বার হেড পড়েছে? পরের বারেও হেড বা টেল পড়ার সম্ভাবনা তাই ফিফটি-ফিফটি।’

গণিত বলছে, দ্বিতীয় দলটি সঠিক। কোনো ঘটনাই বকেয়া থাকে না। কয়েন বা লটারির কোনো স্মৃতি নেই। তবে ভূমিকম্পের ব্যাপারটা একটু আলাদা। কারণ ফল্ট লাইনে চাপ জমতে থাকে, তাই অনেকদিন ভূমিকম্প না হলে সেখানে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আসলেই বাড়ে। কিন্তু এটা ফিজিকস, কোনো র‍্যান্ডম প্রসেস নয়।

দীর্ঘমেয়াদে সমতা: একটি অদ্ভুত গাণিতিক সত্য

এখানেই গল্পের শেষ নয়। টেল পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে না ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। হেড যদি ১০০ বার এগিয়েও থাকে, আপনি যদি অসীম সময় ধরে টস করতেই থাকেন, তবে গণিতের হিসেবে কোনো না কোনো এক সময় হেড ও টেলের সংখ্যা সমান হবেই। এই সম্ভাবনা ১। গণিতের ভাষায় সম্ভাবনা ১ মানে ঘটনাটি নিশ্চিত। যেহেতু আমরা অসীম সময় নিয়ে কথা বলছি, তাই গণিতবিদরা বলেন প্রায় নিশ্চিত।

তার মানে, হেড যদি এক কোটি কোটি বারও এগিয়ে থাকে, তবু আপনি যদি অনন্তকাল টস করেন, টেল সেই গ্যাপ পূরণ করে ফেলবে। তবে এখানে একটা কিন্তু আছে! আপনি যদি ভাবেন, তার মানে তো ব্যালেন্স হবেই, তাহলে ভুল করবেন। কারণ, একইভাবে এটাও গাণিতিক সত্য যে, হেড ও টেলের পার্থক্য একসময় বেড়ে ১০ লাখেও পৌঁছাবে! এটার সম্ভাবনাও ১। অর্থাৎ, গ্যাপ কমবেও আবার গ্যাপ অকল্পনীয়ভাবে বাড়বেও।

লুডুর ছক্কা: কেন আলাদা আচরণ?

কয়েন বাদ দিন, লুডুর ছক্কার কথা ভাবি। ১ থেকে ৬ পর্যন্ত প্রতিটি সংখ্যা পড়ার সম্ভাবনা ১/৬। খেলা শুরুর সময় সব সংখ্যার স্কোর শূন্য। কিছুক্ষণ ফেলার পর সংখ্যাগুলো কমবেশি হবে। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি যদি অনন্তকাল ছক্কা ফেলেন, কোনো এক সময় কি এমন হবে যে ১ থেকে ৬ সবগুলো ঠিক সমান সংখ্যক বার পড়েছে?

কয়েনের ক্ষেত্রে যেমন বলেছিলাম সমান হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত বা ১, ছক্কার ক্ষেত্রে কিন্তু তা নয়! ছক্কার সব সংখ্যা সমান হওয়ার সম্ভাবনা ০.৩৫-এর চেয়েও কম। কেন ছক্কা ও কয়েনের আচরণ আলাদা? এর উত্তর র‍্যান্ডম ওয়াক থিওরিতে লুকিয়ে আছে।

র‍্যান্ডম ওয়াক থিওরি: দ্বিমাত্রিক বনাম ত্রিমাত্রিক জগৎ

বিষয়টা বোঝানোর জন্য একটা গ্রাফের কথা ভাবা যাক। একে বলে র‍্যান্ডম ওয়াক। হেড পড়লে গ্রাফ এক ধাপ ওপরে যাবে, টেল পড়লে এক ধাপ নিচে। আমি কম্পিউটারে ১ লাখ বার টস করার একটা সিমুলেশন করলাম। ফলাফল চমকে দেওয়ার মতো। দেখা গেল, গ্রাফটা শূন্য থেকে শুরু হয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলছে। কিন্তু আশ্চর্য হলো, বেশির ভাগ সময়ই হেড এগিয়ে ছিল! এমনকি ২০ হাজার তম টসের পর হেড ৩০০ ঘর এগিয়ে ছিল। যেহেতু কয়েনের মেমোরি নেই, তাই সে নিজেকে শুধরে নিয়ে শূন্যে ফিরে আসেনি। বরং সে ওই ৩০০-এর আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করেছে।

র‍্যান্ডম ওয়াক থিওরি বলছে, আপনি যদি অনন্তকাল অপেক্ষা করেন, গ্রাফটি অবশ্যই শূন্যে ফিরবে। কিন্তু সেই অনন্তকাল যে কত বড় হতে পারে, তার কোনো ঠিক নেই। দুইবার সমান হওয়ার মাঝখানের সময়টা অসীমও হতে পারে! তাই কেউ যদি ভাবেন, এখন হেড বেশি আছে, তাই একটু পরেই টেল এসে সব সমান করে দেবে; তবে বলতে দ্বিধা নেই তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

ল অব এভারেজ এভাবেই কাজ করে। সে পার্থক্য মুছে দেয় না, বরং বিশাল সংখ্যার নিচে পার্থক্যটাকে নগণ্য বা তুচ্ছ করে দেয়। ধরুন, ১০০ বার টসের পর ৫৫ বার হেড ও ৪৫ বার টেল পড়ল। পার্থক্য ১০। আপনি আরও ১০ লাখ বার টস করলেন। যেহেতু কয়েন নিরপেক্ষ, তাই এই ১০ লাখে গড়ে ৫ লাখ বার হেড ও ৫ লাখ বার টেল পড়বে। তাহলে মোট ফল কী? হেড ৫ লাখ ৫৫ বার এবং টেল ৫ লাখ ৪৫ বার। পার্থক্য কিন্তু সেই দশ-ই রয়ে গেল। কিন্তু অনুপাত দেখুন। শুরুতে হেড ছিল ৫৫ ভাগ। এখন সেটা হয়ে গেল ৫০.০০০৫ ভাগ। অর্থাৎ হেডের অনুপাত ৫০ ভাগের অনেক কাছে চলে এল।

লুডুর ছক্কা: ত্রিমাত্রিক জগতের রহস্য

এবার সেই লুডুর ছক্কার কথায় আসি। কয়েন টসের গ্রাফটা ছিল দ্বিমাত্রিক। গণিতবিদরা প্রমাণ করেছেন, দ্বিমাত্রিক গ্রাফে বা সমতলে এলোমেলোভাবে হাঁটলে আপনি একসময় না একসময় শুরুর জায়গায় ফিরবেনই। এক্ষেত্রে সম্ভাবনা ১, মানে নিশ্চিত। কিন্তু লুডুর ছক্কার জন্য আমাদের দরকার ত্রিমাত্রিক জগৎ বা তারও বেশি। ছক্কার ৬টা পিঠকে যদি আমরা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, ওপর এবং নিচ হিসেবে দেখি, তাহলে এই ছয় দিকে হাঁটাকে মহাশূন্যে ভেসে বেড়ানোর মতো মনে হবে।

গণিতবিদ স্ট্যানিস্ল উলাম প্রমাণ করেছেন, মহাশূন্যে বা ত্রিমাত্রিক জগতে র‍্যান্ডমলি হাঁটলে শুরুর জায়গায় ফিরে আসার সম্ভাবনা মাত্র ০.৩৫ বা ৩৫ ভাগ। অর্থাৎ, মরুভূমিতে (দ্বিমাত্রিক) পথ হারিয়ে এলোমেলো হাঁটলে আপনি একসময় লোকালয়ে ফিরবেনই। কিন্তু মহাকাশে (ত্রিমাত্রিক) পথ হারালে ঘরে ফেরার সম্ভাবনা ৩ বারের মধ্যে মাত্র ১ বার। এ কারণেই লুডুর ছক্কায় সব সংখ্যা সমান হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত নয়, বরং অনেক কম।

তবে শেষের আগে একটা কথা জানাই। এই বইয়ে ত্রিমাত্রিক র‍্যান্ডম ওয়াকের যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে (০.৩৫), তা পুরোপুরি সঠিক নয়। ১৯৩৯ সালে ইংরেজ গণিতবিদ জর্জ ওয়াটসন এটি আরও নিখুঁতভাবে কষেছিলেন। সংখ্যাটি আসলে ০.৩৪০৫৩৭২৯৫৫১...। হয়তো এই পার্থক্য অনেক বড় নয়, কিন্তু তবুও এটা আরও বেশি সঠিক। এ ছাড়া ইউইচি তানাকা নামে এক জাপানি সম্পাদক কম্পিউটার দিয়ে চার মাত্রার জগতে কী হয়, তা বের করেছেন। তিন দিন ধরে কম্পিউটার প্রোগ্রাম চালিয়ে তিনি দেখেছেন, চার মাত্রার জগতে ফিরে আসার সম্ভাবনা আরও কম, প্রায় ০.১৯৩।

সুতরাং, লটারির টিকিট কাটার সময় বা কয়েন টস করার সময় ল অব এভারেজের আশায় বসে থাকবেন না। গণিত বলছে, ভাগ্য তার নিজের পথেই চলে, সে আপনার-আমার হিসেবে ধার ধারে না! সূত্র: হাউ টু কাট আ কেক অবলম্বনে।