বঙ্গভঙ্গ প্রতিবাদ থেকে নোবেলের দ্বারপ্রান্তে: মেঘনাদ সাহার সংগ্রামী জীবন
বঙ্গভঙ্গ প্রতিবাদ থেকে নোবেলের দ্বারপ্রান্তে: মেঘনাদ সাহা

বঙ্গভঙ্গ প্রতিবাদে স্কুল থেকে বহিষ্কার: মেঘনাদ সাহার জীবনের মোড়

সকাল থেকেই ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে চলছিল সাজ সাজ রব। কারণ, পূর্ব বাংলার গভর্নর স্যার বাম্পফিল্ড ফুলারের আগমন ঘটবে সেদিন। কিন্তু স্কুলের সিনিয়র ক্লাসের কিছু ছাত্র এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইল অন্য উদ্দেশ্যে। মাত্র কিছুদিন আগে ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জন বাংলাকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা বাংলার জনগণ মেনে নেয়নি। ছাত্ররা ঠিক করল, ফুলার সাহেবের সামনে ‘বঙ্গভঙ্গ মানি না’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ দেখাবে।

ঘোড়ায় টানা গাড়ি থেকে নেমে ফুলার সাহেব স্কুলে ঢোকার আগেই ছাত্রদের মিছিলের সম্মুখীন হলেন। ‘বঙ্গভঙ্গ মানি না, বঙ্গভঙ্গ বাতিল করো’ স্লোগান জোরদার হওয়ার আগেই শিক্ষক ও গভর্নরের নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

বহিষ্কার ও সংকট: একটি জীবন বদলে যাওয়ার গল্প

মিছিলের পরিণতি কী হতে পারে, তা আঁচ করতে পারেনি ছাত্ররা, এমনকি সবচেয়ে বয়ঃকনিষ্ঠ ছাত্রটিও নয়। সে ছিল মেঘনাদ সাহা, যিনি সরকারি বৃত্তি, বড় ভাইয়ের পাঠানো টাকা ও বৈশ্য সমিতির সহায়তা নিয়ে শেওড়াতলী গ্রাম থেকে ঢাকায় পড়তে এসেছিলেন। পরদিন স্কুলের হেডমাস্টারের তলব এবং বহিষ্কারের চিঠি পেয়ে তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। শুধু বহিষ্কার নয়, সরকারি বৃত্তিও বাতিল করা হলো।

টাকার অভাবে পায়ের স্যান্ডেল কেনা হয়নি বলে কয়েক দিন খালি পায়ে স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেন মেঘনাদ। এদিকে, কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্রদের বীরত্বের কথা এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। পাশের নর্থব্রুক স্ট্রিটের কিশোরীলাল জুবিলী হাইস্কুলের একজন শিক্ষক তাকে নিয়ে এলেন নিজেদের স্কুলে, যেখানে বিনা বেতনে ভর্তি করা হলো এবং হেডমাস্টার বৃত্তির ব্যবস্থা করলেন।

গ্রাম থেকে শহরে: শিক্ষার পথে অদম্য সংগ্রাম

১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর গাজীপুরের শেওড়াতলী গ্রামে জগন্নাথ সাহা ও ভুবনেশ্বরী দেবীর ঘরে জন্ম নেন মেঘনাদ। টানাটানির সংসারে তিনি ছিলেন পঞ্চম সন্তান। গ্রামের টোলে পড়ালেখা শুরু করলেও তৃতীয় শ্রেণির ওপরের স্কুল না থাকায় শিক্ষকদের সুপারিশে শিমুলিয়া গ্রামের মিডল স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসক অনন্ত কুমার দাসের বাড়িতে থাকার শর্ত ছিল থালাবাসন ধোয়া ও গরুর দেখভাল করা।

প্রাথমিক পরীক্ষায় ঢাকা জেলার মধ্যে প্রথম হয়ে মাসিক চার টাকার সরকারি বৃত্তি পান মেঘনাদ। বড় ভাই জয়নাথের পাঠানো পাঁচ টাকা ও বৈশ্য সমিতির দুই টাকা বৃত্তি নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং সরকারি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন।

উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক যাত্রা: কলকাতায় উত্থান

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বাতিল হলে মেঘনাদ গেলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে, যেখানে তাঁর সতীর্থ ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। গণিতে সম্মানসহ বিএসসি (১৯১৩) ও ফলিত গণিতে মাস্টার্স (১৯১৫) শেষ করে বিজ্ঞান কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি সত্যেন বসু ও চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরামণের সঙ্গে কাজ করেন।

মেঘনাদ সাহা জার্মান ভাষা আয়ত্ত করে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের নিবন্ধগুলি সত্যেন বসুর সঙ্গে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যা ছিল প্রথম ইংরেজি অনুবাদ। তাঁর গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেন এবং প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে গবেষণা করেন।

বিজ্ঞান সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রবেশ: একটি বহুমুখী অবদান

১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেও গবেষণার অভাবে ১৯২৩ সালে চলে যান এলাহাবাদে। সেখানে তিনি বিভাগকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন এবং ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। বিজ্ঞান গবেষণার প্রসারের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স, ইন্ডিয়া (১৯৩২) ও ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি (১৯৩৩)।

মেঘনাদ সাহা শেষ জীবনে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, জওহরলাল নেহরুকে বিজ্ঞানবিষয়ক পরামর্শ দিতেন। ১৯৫২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উত্তর-পশ্চিম কলকাতা থেকে লোকসভার সাংসদ নির্বাচিত হন। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ছাড়া ভারতের উন্নতি সম্ভব নয়। কিন্তু ১৯৫৬ সালে মাত্র ৬২ বছর বয়সে অকালমৃত্যু তাঁর পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।

মেঘনাদ সাহার জীবন শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্যের নয়, সংগ্রাম ও দৃঢ় প্রত্যয়েরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা বাংলা ও ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।