বিজ্ঞান: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ও তার বিবর্তন
বিজ্ঞান: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ও বিবর্তন

পৃথিবীতে আর কোনো প্রজাতি নেই, যারা বিজ্ঞানচর্চা করে। এটি এক সামগ্রিক মানবীয় উদ্ভাবন, কালের আবর্তে গড়ে ওঠা সেরিব্রাল কর্টেক্সের কারণে যার উদ্ভব ঘটেছে। এটি কাজ করে, তবে একদম নিখুঁত নয়; ভুলভাবেও ব্যবহৃত হতে পারে। আসলে এটি শুধু একটি হাতিয়ার। তবে আমাদের হাতে থাকা পদ্ধতিগুলোর মধ্যে বিজ্ঞানই সবচেয়ে ভালো, কেননা এটি স্বসংশোধনপ্রবণ, চলমান ও সবকিছুতে প্রয়োগযোগ্য।

বিজ্ঞানের দুটি মৌলিক নিয়ম

বিজ্ঞানের দুটি নিয়ম আছে। প্রথমত, পবিত্র সত্য বলে কিছু নেই; সব অনুমান বা স্বতঃসিদ্ধকে অবশ্যই সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষিত হতে হবে। নির্ভরযোগ্য পাণ্ডিত্যের বা কর্তৃপক্ষের মতামত এখানে মূল্যহীন। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ যেকোনো কিছুই বাতিল বলে গণ্য হবে, অথবা সংশোধন করা হবে। অতএব এটি স্বসংশোধনযোগ্য বৃদ্ধিবৃত্তি, শুধু থাকতে হবে সহনশীলতা ও নমনীয়তা।

মহাবিশ্ব যেমন, তেমন করেই আমরা মহাবিশ্বকে বুঝব। কোনভাবে কেমন হওয়া উচিত, তার সঙ্গে এটি কতটা সাদৃশ্যপূর্ণ—এই ভেবে আমরা বিভ্রান্ত হব না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সামাজিক ব্যবস্থা ও বিজ্ঞান

কোনো জাতি, ঐতিহ্য, দর্শন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা জ্ঞানের পক্ষে আমাদের টিকে থাকার জন্য সম্ভাবনাময় সবকিছুর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। অনেক সামাজিক ব্যবস্থা অবশ্য বর্তমানে বিরাজমান অন্য কোনো কোনোোটির চেয়ে অধিকতর ভালো। বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সেগুলো খুঁজে বের করা ও সমন্বয় করাই আমাদের কাজ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আধুনিক বিশ্ব

ইতিহাসে শুধু একবারই অসাধারণ বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার সম্ভাবনাময় উষা দেখা দিয়েছিল। আয়নীয় জাগরণের উত্তরাধিকারী হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারে অবস্থান নিয়েছিলেন দুই হাজার বছর আগের প্রাচীন যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা। তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাহিত্য, ভূগোল ও চিকিত্সাবিজ্ঞান সম্পর্কে পদ্ধতিগত অধ্যয়নের ভিত্তি। ওই গৌরবময় গ্রন্থাগারের একটি স্ক্রলও আর অবশিষ্ট নেই; জ্বলেপুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে কালের ঝাপটায়। যদিও আমরা এখনো ওই ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে। অতীত থেকে আসা লাখ লাখ সুতার বুননে তৈরি হয়ে চলেছে আধুনিক বিশ্বের রশি ও শিকলের মালা।

গত ৪০ হাজার প্রজন্মের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অর্জনগুলো, অতি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া তাদের বেশির ভাগের কথাই আমরা জানি না, অথবা বিস্মৃত হয়েছে সেগুলো। আমরা প্রত্যেকে কখনো কখনো হাতড়ে মরি বা বিভ্রান্তিতে পড়ি ওসব বড় সভ্যতা নিয়ে—যেমন এবলার প্রাচীন সমাজ, যা উন্নতি লাভ করেছিল মাত্র স্বল্প কয়েক হাজার বছর আগে। এ সম্বন্ধে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। তাহলে বুঝুন, আমরা নিজেদের অতীত সম্পর্কে কতই-না অজ্ঞ!

কার্ল সাগানের কসমস ও বিশ্ব সংস্কৃতি

কার্ল সাগান তাঁর কসমস গ্রন্থে বলেছেন—আমরা একান্তভাবে মনোযোগ দিয়েছি আমাদের পূর্বপুরুষদের কয়েকজনের প্রতি, যাঁদের নাম হারিয়ে যায়নি: ইরাটোস্থেনিস, ডেমোক্রিটাস, অ্যারিস্টারকাস, হাইপেশিয়া, লিওনার্ডো, কেপলার, নিউটন, হাইগেনস, শাপোলিয়, হুমাসন, গডার্ড, আইনস্টাইন—সবাই প্রায় পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে আসা। কেননা, আমাদের গ্রহে সদ্য উদ্ভবরত বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা হলো মূলত পশ্চিমা সভ্যতা; কিন্তু প্রতিটি সংস্কৃতি—চীন, ভারত, পশ্চিম আফ্রিকা, মেসোআমেরিকা—আমাদের বিশ্ব সংস্কৃতিতে তাদের বিশাল অবদান রয়েছে। তাদেরও ছিল প্রথম দিকের বীজ বপনকারী বা প্রভাববিস্তারী চিন্তাবিদেরা।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রাযুক্তিক অগ্রগতি আমাদের গ্রহকে প্রচণ্ড গতিতে একটি একক বিশ্ব সমাজের মধ্য দিয়ে একীভূত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। যদি সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে ধ্বংস না করে বা আমাদের ধ্বংস ছাড়া পৃথিবীর একীভূতকরণ সম্পন্ন করতে পারি, তাহলে আমরা অসাধারণ একটি কাজ সম্পন্নে সমর্থ হব।

মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতার মূল্য

মহাবিস্ফোরণ থেকে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে খণ্ড খণ্ড গবেষণা দিয়ে যে মহাজাগতিক বর্ণনা দিতে আমরা সমর্থ হয়েছি, তাকেই যথার্থভাবে মহাকাব্যিক পুরাণ বলে অভিহিত করতে পারি। মহাজাগতিক বিবর্তনের যেকোনো বিবরণই এটা স্পষ্ট করে দেয় যে পৃথিবীর সব প্রাণী গ্যালাকটিক হাইড্রোজেনের শিল্পকারখানায় সর্বশেষ উত্পাদিত। মহাবিশ্বের অন্য জায়গায়ও একই সমতায় অন্য রকম পদার্থের বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটে থাকতে পারে। তাই আকাশ থেকে আসা কোনো গুঞ্জন শোনার ব্যাকুলতা নিয়ে আমরা কান পেতে রই।

আমরা এমন একটি ধারণা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছি যে কোনো ব্যক্তি বা সমাজ আমাদের থেকে সামান্য আলাদা হলে, কোনোভাবে তারা অদ্ভুত বা অভিনব হলে বা সংখ্যায় স্বল্প হলে আমরা প্রায় সবাই তার দিকে অবিশ্বাস বা ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাই। অথচ পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয়, আমরা দুর্লভ ও সমপরিমাণ বিপন্ন এক প্রজাতি।

মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাবলে, আমরা প্রত্যেকেই মূল্যবান। যদি কোনো মানুষ আপনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে, তবে তাকে তার মতো থাকতে দিন। মনে রাখবেন, লাখো কোটি গ্যালাক্সিতেও আপনি এ রকম আরেকজনকে খুঁজে পাবেন না।

এটাই এ পর্যন্ত অর্জিত বিজ্ঞানের শিক্ষা।

লেখক: বিজ্ঞানবক্তা; সম্পাদক, মহাবৃত্ত (বিজ্ঞান সাময়িকী)

কৃতজ্ঞতা: কার্ল সাগানের হু স্পিকস ফর আর্থ

*লেখাটি ২০২৪ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত