দীনেশ চন্দ্র সেনের বিশ্লেষণে পূর্ব ময়মনসিংহের প্রাচীন সমাজ ও রাষ্ট্র
পূর্ব ময়মনসিংহের প্রাচীন সমাজ ও রাষ্ট্র: দীনেশ চন্দ্র সেন

প্রখ্যাত সাহিত্য-ইতিহাসবিদ ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের গবেষণায় পূর্ব ময়মনসিংহ বা বর্তমান নেত্রকোনা অঞ্চলের প্রাচীন রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের এক অনন্য চিত্র ফুটে উঠেছে। এই অঞ্চলটি প্রাচীনকাল থেকেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ ছিল, যা আজও ইতিহাসবিদদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।

গুপ্ত সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন রাজ্যের উত্থান

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে পূর্ব ময়মনসিংহ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু গুপ্ত শাসনের দুর্বলতার সুযোগে এই অঞ্চল স্বাধীন হয়ে পড়ে এবং পরে প্রাগজ্যোতিষপুরের অধীনে চলে যায়। এ সময় কামরূপ রাজ্যের প্রভাব বিস্তার লাভ করে এবং অঞ্চলটি হিন্দুধর্মের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণ

সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এই অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। তিনি স্থানীয় মানুষের নৈতিকতা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তখনকার সমাজ জ্ঞানচর্চা ও নৈতিকতায় উন্নত ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব ও মুসলিম শাসন

প্রাগজ্যোতিষপুরের পতনের পর পূর্ব ময়মনসিংহে একাধিক ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটে। রাজবংশীয়, কোচ ও হাজং সম্প্রদায়ের নেতারা এসব রাজ্য শাসন করতেন। ১২৮০ সালে সোমেশ্বর সিংহ সুষঙ্গ-দুর্গাপুর অঞ্চল দখল করেন। ১৪৯১ সালে শেরপুরে মজলিশ হুমায়ুন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৫৮০ সালের দিকে ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ী অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে দেওয়ান বংশের সূচনা করেন। কালিয়াজুড়ি, মদনপুর, বোকাইনগরসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে ওঠে, যা পরে মুসলিম শাসনের অধীনে চলে যায় বা করদ রাজ্যে পরিণত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভৌগোলিক কারণে স্বাধীনতা

ড. দীনেশ চন্দ্র সেন উল্লেখ করেছেন, সেনবংশীয় রাজারা পশ্চিম ময়মনসিংহ দখল করতে পারলেও পূর্ব ময়মনসিংহকে সম্পূর্ণভাবে দখল করতে পারেননি। কারণ এই অঞ্চল অসংখ্য নদী, বিল, জলাভূমি ও ঘন জঙ্গলে ভরা ছিল, যা বর্ষাকালে আরও দুর্গম হয়ে উঠত। ফলে এটি দীর্ঘদিন বহিরাগত শক্তির প্রভাব থেকে স্বাধীন ছিল।

ধর্মীয় উদারতা ও সামাজিক স্বাধীনতা

পূর্ব ময়মনসিংহের ধর্মীয় জীবন ছিল ব্যতিক্রমী। এখানে প্রচলিত হিন্দুধর্ম ছিল উদার ও সহনশীল, যেখানে বৌদ্ধধর্মের কর্মবাদ ও হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের মিশ্রণ দেখা যায়। কামরূপে তান্ত্রিক প্রভাব বাড়লেও পূর্ব ময়মনসিংহ সেই ধারার বাইরে থেকে প্রাচীন উদার আদর্শ বজায় রাখে। বল্লাল সেনের কঠোর কৌলিন্য প্রথা ও জাতিভেদের নিয়ম এখানে তেমন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রঘুনন্দনের সামাজিক নিয়মও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, ফলে সমাজে ছিল বেশি স্বাধীনতা ও মানবিকতা।

বিবাহ ও সামাজিক রীতি

জাতিভেদের কঠোরতা কম থাকায় অনুলোম-প্রতিলোম বিবাহ প্রচলিত ছিল। নারীরা নিজের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে পারতেন এবং প্রেমভিত্তিক গন্ধর্ব বিবাহও বিদ্যমান ছিল, যা আজকের সমাজে প্রায় বিলুপ্ত।

পল্লীগাথায় নারীর ভূমিকা

ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের পল্লীগাথা বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিম্নবর্ণের ঘরে বড় হওয়া শিশুকেও সমাজে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হতো। এমনকি নিম্নবর্ণের মাতাকেও সম্মান প্রদর্শনের ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে, যা বর্তমান কঠোর শ্রেণিবিভাজনের তুলনায় বিস্ময়কর। পল্লীগাথাগুলোতে নারী চরিত্র বিশেষভাবে উজ্জ্বল। তারা সামাজিক নিয়ম ভেঙেছেন কিন্তু নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ হারাননি। তারা স্বামীভক্ত, বুদ্ধিমতি, ধৈর্যশীল ও বিপদে বিচক্ষণ ছিলেন। এসব গাথায় নারীর শক্তি, একনিষ্ঠতা ও মানবিকতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।

প্রাসঙ্গিক শিক্ষা

ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের আলোচনায় পূর্ব ময়মনসিংহের প্রাচীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার যে চিত্র পাওয়া যায়, তা একদিকে যেমন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, অন্যদিকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ। এই সমাজ ছিল স্বাধীনচেতা, উদার ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ, যা আজকের সময়েও প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়।