সাক্ষাৎকারে শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: বিজ্ঞান লেখার পথ ও চ্যালেঞ্জ
সাক্ষাৎকারে শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী: বিজ্ঞান লেখার পথ

বিজ্ঞানচিন্তার সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞান লেখক ও সংগঠক শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী তাঁর লেখালেখির পথ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ, বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার বর্তমান অবস্থা এবং নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী করার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

লেখালেখির শুরু ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ

শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী জানান, তাঁর লেখালেখির শুরুটা দেরিতে হলেও এর বীজ পোঁতা হয়েছিল ১৯৮৫-৮৬ সালে, যখন হ্যালির ধূমকেতু দেখা দেয়। সেই সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধূমকেতু দেখার প্রবল কৌতূহল সৃষ্টি হয়। একই বছর কাকতালীয়ভাবে অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের লেখা 'কৃষ্ণ বিবর' বইটি হাতে পান, যা তাঁর জীবন বদলে দেয়। এরপর জামাল স্যারের 'দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স' বই পড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। তিনি গণিতের ছাত্র ছিলেন এবং দেখেছিলেন যে বেশির ভাগ গণিতবিদই জ্যোতির্বিজ্ঞানীও ছিলেন। গাণিতিক হিসাব-নিকাশের মাধ্যমেই নেপচুনের অস্তিত্ব প্রথম জানা যায়, যা পরে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। গণিতের এই কারসাজি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার তাঁকে প্রথম দিকে প্রবলভাবে টানে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার চ্যালেঞ্জ ও শূন্যতা

বাংলায় মহাকাশ ও বিজ্ঞান নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে বড় কোনো শূন্যতা বা চ্যালেঞ্জ তিনি দেখেন না। তিনি জামাল নজরুল ইসলামের একটি কথার উল্লেখ করেন: 'অনেকের ধারণা, ভালো ইংরেজি না জানলে বিজ্ঞানচর্চা করা যাবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। মাতৃভাষায়ও ভালো বিজ্ঞানচর্চা ও উচ্চতর গবেষণা হতে পারে।' তিনি মনে করেন, ছেলেবেলা থেকেই মাতৃভাষা ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে এবং প্রচুর বই পড়তে হবে। শরৎচন্দ্রের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, 'মাতৃভাষাকে বড় করে না তুললে চিন্তা চিরদিন ছোট হয়ে থাকবে।' তিনি বাংলার নবজাগরণের নায়কদের উদাহরণ দেন, যাঁরা সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি মাতৃভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রবন্ধই ছিল বিজ্ঞানবিষয়ক। তাই তাঁর মতে, মাতৃভাষায় ভালো দখল, বিজ্ঞানের ভালো বোধ এবং মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে বিজ্ঞান লেখায় কোনো অসুবিধা নেই। পরিভাষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে নতুন পরিভাষা তৈরি করে নেওয়া বা মূল ভাষার শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন নিউটন ক্যালকুলাস সৃষ্টি করেছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিজ্ঞান বই লেখার প্রক্রিয়া

বিজ্ঞান বই লেখার সময় গবেষণার বিষয়বস্তুকে সাধারণ পাঠকের উপযোগী ভাষায় আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী বলেন, বিজ্ঞানীদের গবেষণাই বড় আবিষ্কারের ভিত্তি। একজন বিজ্ঞান লেখকের প্রধান কাজ হলো এসব আবিষ্কারকে সাধারণ পাঠকের জন্য সহজ-সরল ভাষায় প্রকাশ করা। গাণিতিক সমীকরণ এড়িয়ে চলতে হয়, কারণ তা পাঠকের কাছে জটিল লাগতে পারে। তিনি 'জনপ্রিয় বিজ্ঞান' বা 'বিজ্ঞানসাহিত্য' ধারণার কথা বলেন, যেখানে বিজ্ঞানের ইতিহাসও জড়িয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রথম সমাধানকারী কার্ল শোয়ার্জশিল্ডের গল্প বলেন। শোয়ার্জশিল্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে আইনস্টাইনের তত্ত্বের সমাধান বের করেন এবং তা আইনস্টাইনের কাছে পাঠিয়ে দেন। এভাবে গল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়।

বিজ্ঞানীদের জীবনী থেকে শিক্ষা

বিজ্ঞানীদের জীবনী লেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষই সংগ্রামী, এবং বিজ্ঞানীরাও এর ব্যতিক্রম নন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিপ্লবী চরিত্র দেখা যায়, যেমন কোপার্নিকাস, ব্রুনো ও গ্যালিলিও। সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে কোপার্নিকাসকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, আর গ্যালিলিওকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়েছে। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতার কয়েকটি চরণ উদ্ধৃত করে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

শিশু-কিশোরদের মধ্যে কৌতূহল ও যুক্তিবোধ গঠনে মহাকাশের গল্প

নক্ষত্র-মহাকাশের গল্প শিশু-কিশোরদের মধ্যে কৌতূহল ও যুক্তিবোধ গড়ে তুলতে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করেন শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকী। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নক্ষত্র দেখে পথ চলা, কৃষিকাজ ও সময় নির্ণয় করত। শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি কৌতূহলী হয় এবং সবকিছু ভেঙেচুরে দেখতে চায়। এই সহজাত প্রবণতা থেকেই যুক্তিবোধ ও জিজ্ঞাসা তৈরি হয়। তাই শিশুদের জন্য বিজ্ঞানবিষয়ক বই বেশি করে প্রকাশ করা এবং তাদের বিজ্ঞানের চমকপ্রদ গল্প শোনানো প্রয়োজন।

বিজ্ঞান শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও উন্নতির উপায়

দেশে অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞানকে কঠিন মনে করে দূরে সরে যায়। এর কারণ হিসেবে তিনি বিদ্যালয়গুলোতে আনন্দদায়ক বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থার অভাব, বিজ্ঞানাগার ও লাইব্রেরির অপ্রতুলতা এবং হালনাগাদ বইয়ের অভাবকে চিহ্নিত করেন। তিনি প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে বিজ্ঞান ক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন, যেখানে বিজ্ঞান মেলা, বক্তৃতা ও অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হবে। আকাশ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা দূরবিন দিয়ে গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা বা ধূমকেতু দেখতে পাবে, যা তাদের বিজ্ঞানের প্রতি ভীতি দূর করবে। তিনি 'বাঙালিরা বিজ্ঞান গবেষণা করতে পারে না' এই ধারণাটিকে ভুল বলে উড়িয়ে দেন। তিনি অমল কুমার রায়চৌধুরীর উদাহরণ দেন, যাঁর নামে 'রায়চৌধুরী ইকুয়েশন' রয়েছে, যা স্টিফেন হকিং তাঁর সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব প্রমাণে ব্যবহার করেছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আবিষ্কারের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী করতে বই, ম্যাগাজিন ও বিজ্ঞান লেখকদের ভূমিকা

নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী করতে বই ও ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বিজ্ঞান লেখকদের পাশাপাশি বিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর বই লিখতে হবে এবং শহরের বাইরে মফস্বল ও গ্রামগঞ্জেও বই-ম্যাগাজিনের প্রসার ঘটাতে হবে। তিনি 'বিজ্ঞানচিন্তা' ম্যাগাজিনের প্রশংসা করেন, যা নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং দেশে বিজ্ঞানের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞানের শিক্ষকরা নিজ নিজ এলাকায় বিজ্ঞান বক্তৃতা ও অলিম্পিয়াডের আয়োজন করতে পারেন।

প্রযুক্তি ও এআইয়ের যুগে জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখার গুরুত্ব

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির মধ্যে জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখার গুরুত্ব বদলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে এবং আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে হালনাগাদ হতে হচ্ছে। প্রযুক্তির কারণে এখন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বই লেখা ও প্রকাশ করা সম্ভব। তিনি মাতৃভাষায় গবেষণাপত্র প্রকাশে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। চীন, জাপান বা কোরিয়ার মতো দেশগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার নিজ নিজ মাতৃভাষায় অনুবাদ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে, এবং আমাদেরও একই কাজ করতে হবে।

আকাশ দেখতে ও বিজ্ঞান শিখতে চাওয়াদের জন্য পরামর্শ

যাঁরা আকাশ দেখতে চান, বিজ্ঞান শিখতে চান বা বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে চান, তাঁদের জন্য শরীফ মাহমুদ ছিদ্দিকীর তিনটি পরামর্শ: বই পড়ুন, অনুসন্ধিৎসু হোন এবং আনন্দের সঙ্গে কাজ করুন, অর্থাৎ লেগে থাকুন। তিনি বলেন, শেখার কোনো সহজ পথ নেই। আগ্রহী ব্যক্তি নিজে থেকেই আকাশ দেখবেন, বাইনোকুলার ও টেলিস্কোপ সংগ্রহ করবেন, এমনকি নিজেই টেলিস্কোপ তৈরি করতে পারেন। তিনি উইলিয়াম হার্শেলের উদাহরণ দেন, যিনি পেশায় গায়ক ছিলেন কিন্তু নিজে দূরবিন তৈরি করে ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কার করেন। তাই আগ্রহ ও অধ্যবসায়ই সাফল্যের চাবিকাঠি।