আইনি জটিলতা কাটিয়ে এপ্রিলে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের ওপর চাপের ছায়া
দীর্ঘ আইনি জটিলতার পর ২০২৫ সালের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী নতুন ও পুরোনো পাঠের চাপে পড়েছে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা।
শিক্ষার্থীদের ওপর দ্বিমুখী চাপ
একদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পঞ্চম শ্রেণির পুরোনো সিলেবাস পুনরায় ঝালিয়ে নিয়ে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। অনেক শিক্ষার্থী গত বছরের পাঠ্যবই ও গাইড বই ইতিমধ্যে বিক্রি করে দিয়েছে, যা নতুন করে সংগ্রহ করা অনেক পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু নতুন শিক্ষাবর্ষের বইয়ের সঙ্গে পুরোনো বইয়ের অনেকখানি অমিল রয়েছে, ফলে প্রস্তুতির প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য
গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত বছরের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিল মাসে ঈদুল আজহার আগে অনুষ্ঠিত হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ বছর প্রথমবারের মতো কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
বৃত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৮০ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২০ শতাংশ কোটা পাবে। পাঁচটি বিষয়ে মোট ৪০০ নম্বরের এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ১০০ নম্বর করে এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৫০ নম্বর করে বরাদ্দ থাকবে। এটি কোনো সাধারণ বার্ষিক পরীক্ষা নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি পরীক্ষা, যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাসে অংশ নিতে হবে।
বৃত্তির সংখ্যা ও আর্থিক সুবিধা
এবার প্রাথমিক বৃত্তি দেওয়া হবে মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে। মেধাবৃত্তির সংখ্যা ৩৩ হাজার, যার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ২৭ হাজার ৫০০ ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৫ হাজার ৫০০। সাধারণ বৃত্তির সংখ্যা ৪৯ হাজার ৫০০, যার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৪১ হাজার ২৫০ ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৮ হাজার ২৫০ বৃত্তি। মেধাবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা এককালীন ২২৫ টাকা ও মাসে ৩০০ টাকা পাবে, আর সাধারণ বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা এককালীন ২২৫ টাকা ও মাসে ২২৫ টাকা করে পাবে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, আগামী বছর থেকে (২০২৭ সালে) প্রাথমিক বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা করা হবে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ
হঠাৎ বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে অভিভাবকদের সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাদের মতে, নিয়মিত ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস ও প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি আগের বছরের পাঠ্যবই পড়ে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যসূচি, শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবই ও শিখনপদ্ধতি পুরোপুরি বদলে গেছে, যা শিশুদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সাতক্ষীরা জেলার একটি স্কুলের একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, তার সন্তানকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য প্রস্তুত করাচ্ছেন, ইতিমধ্যে পড়াশোনার ব্যাপক চাপ রয়েছে। এর ওপর আবার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তার সন্তান হিমশিম খাচ্ছে। শুধু এই এক পরিবার নয়, দেশের অসংখ্য পরিবার এখন একই সমস্যায় পড়েছে। বিশেষ করে যে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের জন্য এই অতিরিক্ত চাপ মারাত্মক মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বইয়ের সমস্যা ও অংশগ্রহণে অনীহা
খুলনার দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলে যাওয়া শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করেও তাদের স্কুলে আনা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছে না, কারণ তারা গত বছরের বই ইতিমধ্যে বিক্রি করে দিয়েছে। গাজীপুরের একটি কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল, কিন্তু বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আবেদন করাতে অভিভাবকদের সঙ্গে গত এক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ করে মাত্র পাঁচ জনকে পাওয়া গেছে।
শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তড়িঘড়ি বই-নোট গাইড জোগাড় করতে পারলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে। রাজশাহীর মোহনপুরের একটি স্কুল থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে চেয়েছিল স্থানীয় বাসিন্দা আফজাল হোসেনের ছেলে। আফজাল পেশায় হোটেল শ্রমিক। তিনি বলেন, ‘ছেলের রোল ছিল ১। সেজন্য বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষকরা চাপাচাপি করছিলেন। বহু কষ্টে গাইড কিনে দিয়েছিলাম। ফাইভ শেষ হওয়ার পর সেই গাইড বিক্রি করে দিয়েছে। ঐ টাকার সঙ্গে কিছু টাকা দিয়ে সিক্সের জন্য গাইড কিনেছে। এখন যদি ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষা হয়, তাহলে ছেলেটা পরীক্ষা দিতে পারবে না। ভালো ছাত্র, কিন্তু এখন পরীক্ষা দিলে ও কী লিখবে? ও তো ফাইভের পড়া ভুলে গেছে। এখন যে পড়বে, সেই উপায়ও নেই। বই নেই, গাইড নেই।’
আইনি জটিলতার পটভূমি
দীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রাথমিকে বৃত্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। নীতিমালা তৈরি, মানবণ্টন প্রকাশ, নমুনা প্রশ্নসহ সব প্রস্তুতি শেষ করা হয়। ঠিক সেসময়ে সামনে আসে আইনি জটিলতা। বৃত্তি পরীক্ষার নীতিমালা অনুযায়ী, শুধু দেশের সরকারি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির যেসব শিক্ষার্থী বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নেবে, তাদের মধ্য থেকে ৪০ শতাংশ পরীক্ষা দিতে পারবে। নীতিমালার এমন নিয়মে ক্ষুব্ধ কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
নীতিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পাবলিক ল্যাবরেটরি স্কুলের পরিচালক ফারুক হোসেন, ‘শিক্ষক-অভিভাবক প্রতিনিধিসহ ৪২ জন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত বছরের ৩ নভেম্বর হাইকোর্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করেন।’ পাশাপাশি ২০০৮ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালার আলোকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগ্য শিক্ষার্থীদের সুযোগ দিয়ে পরীক্ষার আয়োজন করতে নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে একই বছরের ২৬ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক লিভ টু আপিল করেন। তাতেও রায় সরকারের পক্ষে আসেনি।
আইনি জটিলতায় পড়ে কৌশলে পরীক্ষার নাম থেকে ‘বৃত্তি’ এড়িয়ে ‘মেধা যাচাই’ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। বিষয়টি জানাজানি হলে ফের হাইকোর্টে রিট করেন কিন্ডারগার্টেনের অভিভাবকরা। এতে আটকে যায় ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা, যা এখন এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
