জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী নির্যাতনের মর্মান্তিক ঘটনা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক ছাত্রীকে তার ভাড়া বাসায় আটকে রেখে মারধর ও পুড়িয়ে দেওয়ার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ নির্যাতনমূলক ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ছাত্রী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করার পর আশুলিয়া থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের পরিচয়
ভুক্তভোগী ছাত্রী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, অভিযুক্ত তারিকুল ইসলাম একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী। পুলিশ ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে প্রথমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি তার বিভাগের এক নারী শিক্ষকের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
ভুক্তভোগীর বরাত দিয়ে ওই নারী শিক্ষক জানান, সাবেক ছাত্র তারিকুল ইসলামের সঙ্গে ভুক্তভোগী ছাত্রীর পূর্বে সম্পর্ক ছিল, যা পরে ভেঙে যায়। মঙ্গলবার ওই সাবেক ছাত্র ভুক্তভোগীর হলের সামনে গিয়ে নানা অগ্রহণযোগ্য কাজ করেন। একপর্যায়ে তিনি কথা বলার জন্য তাকে বাসায় যেতে জোরাজুরি শুরু করেন। ছাত্রী রাজি না হলে তিনি তাকে ব্ল্যাকমেল করেন। পরে ভুক্তভোগী বাধ্য হয়ে তার বাসায় যান।
সেখানে পৌঁছানোর পর ছাত্রীর মুখ টেপ দিয়ে আটকে মারধর করা হয় এবং তার হাতে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়। এরপর বাসার কক্ষের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে ওই সাবেক ছাত্র চলে যান। তখন ভুক্তভোগী অন্যের ফোন ব্যবহার করে ৯৯৯-এ কল দেন। আশপাশের লোকজন প্রথমে বিষয়টি ব্যক্তিগত সমস্যা ভেবে এগিয়ে আসেননি, পরে জড়ো হন।
পুলিশের তৎপরতা ও উদ্ধারকাজ
আশুলিয়া থানা পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ছাত্রীকে উদ্ধার করে। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্ত তারিকুল ইসলাম ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন ও নিজের ল্যাপটপ নিয়ে পালিয়ে যান। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দড়ি ও একটি হাতুড়ি জব্দ করেছে, অভিযুক্তের পাসপোর্টও আটক করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও আইনি পদক্ষেপ
উদ্ধারের পর ভুক্তভোগীকে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। চিকিৎসক তানভীর হোসেন জানান, ভুক্তভোগীর হাতে তিন থেকে চার সেন্টিমিটার জায়গায় পোড়া ক্ষত রয়েছে। ক্ষত গভীর না হলেও বার্ন চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা না থাকায় তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেফার করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুবেল হাওলাদার বলেন, ‘ভুক্তভোগী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলাটি তদন্তাধীন এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে এবং প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম ঘটনাটি সম্পর্কে বলেন, ‘ঘটনাটি সাবেক এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। তবে এ বিষয়ে আমার কাছে এখনও কোনও লিখিত অভিযোগ আসেনি। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে।
এই ঘটনা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশেপাশের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশ অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ভুক্তভোগী ছাত্রীকে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
