নিয়াজ আহমদের পদত্যাগ: বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ধার মিশন শেষ, বিদায়ের কারণ ও অর্জন
নিয়াজ আহমদের পদত্যাগ: বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ধার মিশন শেষ

নিয়াজ আহমদের পদত্যাগ: বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ধার মিশন শেষ, বিদায়ের কারণ ও অর্জন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ পদত্যাগের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন একটি সাক্ষাৎকারে। তিনি উল্লেখ করেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রান্তিকালে দায়িত্ব নেন, যখন প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি অচল ছিল। তার মতে, এটি ছিল একটি উদ্ধারকারী মিশন, কখনোই চাকরি হিসেবে দেখেননি। নিয়োগপত্রে সাময়িক নিয়োগের কথা উল্লেখ ছিল বলেও জানান তিনি।

পদত্যাগের প্রেক্ষাপট ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া

নিয়াজ আহমদ বলেন, তিনি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলে মন্ত্রী তাকে মন পরিবর্তন করেছেন কিনা জানতে চান। তিনি জবাব দেন, এটি দীর্ঘদিনের চিন্তার ফল, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে শূন্যতা তৈরি না হওয়ার জন্য সমঝোতার মাধ্যমেই বিদায় নিতে চান। তিনি পদ আঁকড়ে থাকাকে চাকরি হিসেবে বিবেচনা করেন, যা প্রকৃত দায়িত্ব পালনের অন্তরায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের শুভচিন্তা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

১৮ মাসের দায়িত্বে প্রধান তিন অর্জন

নিয়াজ আহমদ তার ১৮ মাসের দায়িত্বকালে তিনটি বড় অর্জনের কথা তুলে ধরেন। প্রথমত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংহত হয়েছে, যেমন সংসদ ও ডাকসু। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া রোধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গবেষকদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে, যার ফলস্বরূপ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ৩২ জন গবেষক স্থান পেয়েছেন। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবর্তন ও হলের গণরুম সংস্কৃতির অবসান ঘটানো হয়েছে, এবং প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে সিট দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

একাডেমিক উন্নয়ন ও ব্যর্থতা

একাডেমিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু উন্নয়ন হয়েছে বলে জানান নিয়াজ আহমদ। একাডেমি-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্প, এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা সহকারী হিসেবে নিয়োগের সুযোগ তৈরি উল্লেখযোগ্য। তবে ওবিই সিলেবাস পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি, মাত্র ৫৫ শতাংশ বিভাগে এটি হয়েছে। ব্যর্থতা হিসেবে গবেষণায় পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সময় ব্যয় হওয়ার কথা বলেন তিনি।

ভয়ের সংস্কৃতি দূরীকরণ ও নতুন চ্যালেঞ্জ

নিয়াজ আহমদ দাবি করেন, ভয়ের সংস্কৃতি দূর হয়েছে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বেড়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অযৌক্তিক ব্যবহার এবং ক্যাম্পাস নিরাপত্তার সঙ্গে জনপরিসরের সমন্বয় করতে গিয়ে কিছু সীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি প্রক্রিয়া মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

অভিযোগের জবাব ও ডাকসু নির্বাচন

ছাত্রসংগঠনের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেন নিয়াজ আহমদ। তিনি বলেন, তার কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লেষ নেই। ডাকসু নির্বাচনে গণনায় কিছু ভুল ঠিক করা হয়েছে, কিন্তু ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়েনি। নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে সব রাজনৈতিক ঘরানার ব্যক্তি ছিলেন, এবং বড় মাপের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

লেজুড়বৃত্তি ও সামাজিক চুক্তি

লেজুড়বৃত্তি বন্ধে একটি সমঝোতাভিত্তিক সামাজিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন নিয়াজ আহমদ। তিনি বলেন, প্রশাসনিক পদক্ষেপে এটি সম্ভব নয়, এবং আলোচনা জিইয়ে রাখা দরকার। ডাকসু নির্বাচনের পর এই দাবি কমে গেলেও, কমিটি এখনো সক্রিয় আছে বলে জানান তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিদায়ের বার্তা

পদত্যাগের পর নিয়াজ আহমদ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে ফিরে যাবেন, কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন এবং গবেষণা চালিয়ে যাবেন বলে জানান। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পেলে তা গ্রহণ করবেন বলেও উল্লেখ করেন। তিনি জুলাই আন্দোলনের অগ্রভাগের ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ভালো পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরে আনন্দিত বলে মন্তব্য করেন।