শহীদ জোহার আত্মত্যাগ স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক দিবস পালন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ শামসুজ্জোহার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শিক্ষক দিবস পালন করা হয়েছে। বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে জোহা স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে স্মারক বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি দিনটিকে জাতীয়ভাবে উদযাপন না করার পেছনে সামগ্রিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন।
শহীদ জোহার আত্মত্যাগের ইতিহাস
১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্দেশে ‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার; আই সেইড, ডোন্ট ফায়ার। কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার গায়ে গুলি লাগে’ বলেছিলেন তৎকালীন প্রক্টর সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা। এরপরই তিনি সৈন্যদের বন্দুকের নিশানা হন এবং বেয়নেটের আঘাতে নিহত হন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে তাঁর আত্মত্যাগ এই আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে রূপ দিতে সহায়তা করেছিল। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃত।
শিক্ষক দিবসের কর্মসূচি ও দাবি
প্রতিবছরের মতো এবারও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনটি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ভবন ও একাডেমিক ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। উপাচার্য সালেহ্ হাসান নকীবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শহীদ শামসুজ্জোহার সমাধি ও জোহা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট, আবাসিক হল, সাংবাদিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায়।
অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:
- সকাল ১০টায় সিনেট ভবনে জোহা স্মারক বক্তৃতা
- বেলা ১১টায় টিএসসিসিতে রচনা প্রতিযোগিতা
- কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কোরআনখানি ও বিশেষ মোনাজাত
- বাদ আসর শহীদ শামসুজ্জোহা হলে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, ১৮ ফেব্রুয়ারি যেন জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে সারা দেশে পালন করা হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ৫৭ বছর পরেও দিনটি এখনো জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি।
মহিউদ্দিন আহমদের বক্তব্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ স্মারক বক্তৃতায় বলেন, ‘ড. শামসুজ্জোহা হচ্ছেন একেবারেই ব্যতিক্রম ও অনন্য। তিনি একমাত্র শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সদস্য, যিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। এটি তাঁর আগে কেউ কখনো করেনি, পরেও কেউ করেনি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘১৮ ফেব্রুয়ারি আমরা জাতীয়ভাবে কেন উদযাপন করছি না, এটার পেছনে আমাদের সামগ্রিক একটা ব্যর্থতা আছে। এই দিবসটি জাতীয়ভাবে উদযাপন করা উচিত। কারণ, এখানে তিনি ব্যতিক্রম। এ রকম একটি উদাহরণ তো আমাদের দেশে নেই।’
বন্ধুসভার ভূমিকা
সকাল ১০টায় প্রথম আলো বন্ধুসভার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যরা শামসুজ্জোহার সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তাঁরা দিনটিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। বন্ধুসভার সভাপতি সুইটি রাণী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ড. জোহার শাহাদতের পর থেকেই ১৮ ফেব্রুয়ারিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তবে গত ৫৭ বছর ধরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এ দিনটিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
এই অনুষ্ঠানগুলো শহীদ শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগকে স্মরণ করে এবং তাঁর অবদানকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। শিক্ষক দিবস হিসেবে দিনটি পালন করা হলেও, জাতীয় স্বীকৃতির অভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বিদ্যমান।
