শহীদ ড. শামসুজ্জোহা দিবসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা
শহীদ ড. শামসুজ্জোহা দিবসে রাবি বন্ধুসভার শ্রদ্ধা নিবেদন

শহীদ ড. শামসুজ্জোহা দিবসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুসভার স্মরণ ও দাবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে শহীদ ড. শামসুজ্জোহা দিবস। ১৮ ফেব্রুয়ারি এই বিশেষ দিনটিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভাও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে। বন্ধুসভার সদস্যরা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শ্রদ্ধা নিবেদন, এক মিনিট নীরবতা পালন এবং একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভার আয়োজন করেন, যা দিনটির তাৎপর্যকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে।

এক অনন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস

১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে আজকের দিনে ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেন ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ আত্মদান দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম শহীদ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত, যাঁর জীবন ও মৃত্যু শিক্ষকতা পেশার মর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বন্ধুসভার আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দের বক্তব্য

সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার সভাপতি সুইটি রাণী। সাধারণ সম্পাদক বাঁধন রায়ের সঞ্চালনায় উপদেষ্টা তুহিনুজ্জামান বলেন, ‘সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস—যে ইতিহাস জানার কথা ছিল পুরো জাতির।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

উপদেষ্টা রিয়াদ খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘একজন শিক্ষকের আত্মত্যাগের এই অনন্য উদাহরণ শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পুরো বাংলাদেশের গর্ব।’ তিনি ড. জোহার আদর্শকে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক মুয়াজ্জিন হোসাইন শহীদ শিক্ষকের মানবিকতা ও সাহসিকতার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে আমরা একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করতে পারি।’ তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার উপর জোর দেন।

জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে স্বীকৃতির দাবি

সভাপতি সুইটি রাণী তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রাবি প্রশাসন ড. জোহার শাহাদতের পর থেকেই ১৮ ফেব্রুয়ারিকে “শিক্ষক দিবস” হিসেবে পালন করে আসছে। তবে গত ৫৭ বছর ধরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এ দিনটিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’ তিনি সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেন।

বন্ধুসভার সদস্যরা আশা প্রকাশ করেন যে মহান এই শহীদ শিক্ষকের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে সরকার শীঘ্রই ১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, যা শিক্ষক সমাজের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হবে।

মর্মস্পর্শী স্মৃতি ও উপস্থিতি

আলোচনায় বন্ধুসভার সদস্যরা ড. জোহার সেই মানবিক সাহসিকতার কথাও স্মরণ করেন—‘আজ আমি ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত। এরপর কোনো গুলি হলে তা ছাত্রকে না লেগে যেন আমার গায়ে লাগে।’ এই মর্মস্পর্শী উচ্চারণ প্রমাণ করে যে একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের জন্য কতটা আত্মত্যাগী হতে পারেন, যা শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্রাবন্তী সরকার, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নাইম হাসান এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক রায়হান-আর-রাফি। তাঁরা সকলেই শহীদ শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তাঁর আদর্শকে ধারণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বন্ধুসভা শুধু একটি দিবস পালনই করেনি, বরং জাতীয় স্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে, যা শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।