আল-আজহারে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইফতার আয়োজন: ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত চিত্রপট
বাইতুজ জাকাত ওয়া সদকা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে, শাইখুল আজহার ড. আহমেদ তৈয়বের তত্ত্বাবধানে প্রতিবছরের মতো এবারও আল-আজহারে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইফতারের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আয়োজনটি কেবল একটি খাবার পরিবেশনের অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি হৃদয়ের সংযোগ, ভ্রাতৃত্বের স্পন্দন এবং বৈশ্বিক মুসলিম ঐক্যের এক জীবন্ত চিত্রপট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এই আয়োজন এক নীরব মহিমায় রূপ নেয়, যেখানে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও আন্তরিকতা একসূত্রে গাঁথা হয়ে উঠেছে।
শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রবেশ ও অপার্থিব পরিবেশ
আসরের নামাজ শেষ হতেই মসজিদের পূর্ব পাশের গেট দিয়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের সুশৃঙ্খল প্রবেশ। তারা এগিয়ে যায় ভেতরের বিশাল প্রাঙ্গণের দিকে, যেখানে প্রবেশমুহূর্তেই হৃদয়ে জন্ম নেয় এক অপার্থিব অনুভূতি। সামনে ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদ, চারপাশে কাঠের নকশাদার পর্দা এবং মাঝখানে সাদা টাইলস করা প্রশস্ত উঠান দর্শকদের মুগ্ধ করে। নারীদের জন্য পৃথক পরিসর রয়েছে, যেখানে তারা ইফতার করেন, নামাজ আদায় করেন এবং ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন।
বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থীদের একত্রিত হওয়া
প্রায় ১২০টি দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে সমবেত হন, যার মধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, সুদানসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আগত তরুণেরা অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ থেকেও বহু শিক্ষার্থী এই মিলনমেলায় অংশ নেন। তবে এখানে জাতীয়তার রেখাগুলো মুছে যায় এবং কেবল একটি পরিচয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আমরা মুসলমান, আমরা এক উম্মাহ। ভাষা, উচ্চারণ ও পোশাকের বৈচিত্র্য সত্ত্বেও সবার হৃৎস্পন্দন এক ছন্দে বাঁধা থাকে।
ইফতারি পরিবেশনের সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া
আসরের পরপরই খোলা উঠানে শুরু হয় ইফতারি পরিবেশনের প্রস্তুতি। নিঃশব্দে এবং সুপরিকল্পিতভাবে ইফতারসামগ্রী সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়। কোথাও কোনোরকম হইচই বা বিশৃঙ্খলা নেই; প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে অবিচল থেকে ইবাদতের অংশ হিসেবেই কাজটি সম্পন্ন করেন। এই দৃশ্য কেবল আয়োজনের নয়, বরং এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার এক অনুপম শিক্ষা প্রদান করে।
কোরআন তিলাওয়াত ও নামাজের মর্যাদাপূর্ণ মুহূর্ত
আজানের প্রায় ১৫ মিনিট আগে এক কারি সুমিষ্ট কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠধ্বনি সন্ধ্যার আকাশে ভেসে ওঠে এবং মিনারের গায়ে মৃদু প্রতিধ্বনি তোলে। সাদা উঠান, প্রাচীন স্থাপত্য এবং নিমগ্ন শ্রোতাদের সমন্বয়ে এক অতল সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। তিলাওয়াত শেষ হতেই মাগরিবের আজান ধ্বনিত হয় এবং প্রত্যেকের সামনে রাখা ইফতারি থেকে খেজুর ও পানি আহার করে সবাই দ্রুত নামাজে দাঁড়িয়ে যান। সরলতায় যে গভীর মর্যাদা লুকিয়ে থাকে, এই দৃশ্য তার উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
ইফতারির স্বাদ ও আত্মার পুষ্টি
নামাজ শেষে বাকি খাবার পরিবেশন করা হয়, যার মধ্যে জুস, পানি, ভাত, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সস, রুটি ও কোপ্তা অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের ইফতারির রঙিন আয়োজন যেমন আলাদা স্বাদ বহন করে, তেমনি আল-আজহারের ইফতারিও এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করে। এখানে জাঁকজমক কম থাকলেও তৃপ্তি গভীর হয়, কারণ এই আহার কেবল শরীরের নয়, বরং আত্মারও পুষ্টি জোগায়।
ইফতারের পরের প্রশান্তিময় পরিবেশ
ইফতারের পর কেউ তারাবিহর প্রস্তুতি নেন, কেউ নীরবে বসে থাকেন প্রাঙ্গণে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে মৃদুস্বরে আলাপ করেন। তবে পরিবেশজুড়ে এক অনুচ্চারিত শ্রদ্ধা ও প্রশান্তি বিরাজ করে। মনে হয়, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত এই তরুণেরাই ভবিষ্যতের আলোর বাহক, যারা কোরআনের জ্ঞান ও নৈতিকতার শিক্ষা নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরবেন।
ইসলামের সম্মিলিত মানবিকতার শিক্ষা
আল-আজহারের সাদা উঠানে প্রতিদিনের এই ইফতার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়, এটি সম্মিলিত মানবিকতারও শিক্ষা। পাঁচ হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে যখন খেজুর হাতে তুলে নেন, তখন তা কেবল একটি মুহূর্ত নয়, বরং ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যুক্ত এক জীবন্ত ঐক্যচিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রমজানের এই সন্ধ্যায় আল-আজহারের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় যে বিশ্ব যত বিভক্তই হোক, ইমানের বন্ধন অটুট থাকে। এখানে আমরা শিখি বিনয়, শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতা, এবং হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হয় এক নীরব স্বীকারোক্তি—আমাদের পরিচয় একটাই, আমরা মুসলমান।
