ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে চলমান স্থবিরতা: নাগরিকদের ভোগান্তি ও নির্বাচনের জোর দাবি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পটপরিবর্তনের পর থেকেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, সিদ্ধান্তহীনতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রায় থমকে আছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেড় বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে— এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচিত সরকারও ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখনও দুই সিটি করপোরেশনের উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক কার্যক্রমে স্থবিরতা কাটেনি।
নাগরিকদের ভোগান্তি ও মশক আতঙ্ক
ঢাকার দুই সিটির বাসিন্দাদের প্রধান অভিযোগ মশক নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তাদের দাবি, বিগত সময়ে সমস্যা হলে কাউন্সিলরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যেতো। কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। ডিএসসিসির মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা খন্দকার মাহবুব বলেন, “নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং জনগণের মধ্যে কিছু বিষয় আছে যা খুব সহজেই সমাধান সম্ভব। সেটা কখনোই প্রশাসক দিয়ে হয় না। কারণ যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় না— তারা জনগণের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে পারে না। এমনি উন্নয়ন কাজেও তাদের অনীহা থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এখন মশা এবং ল্যান্ডফিলের বর্জ্য পোড়ানোর গন্ধে অতিষ্ঠ। মশা নিধন বা বর্জ্য থেকে সার উৎপাদনের মতো বড় উদ্যোগগুলো প্রশাসক দিয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।” নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় জবাবদিহি করার জায়গা নেই বলেও জানান তিনি।
৪৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু সুফিয়ান বলেন, “সিটি করপোরেশনের যেসব সেবা আছে বিশেষ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন পরিচালনা, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, খাল ও ড্রেনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, পানি সরবরাহ ও পানি নিষ্কাশন প্রণালির ব্যবস্থা করা, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, সড়কবাতি স্থাপন ও সংস্কার, এসব উন্নয়নমূলক কাজ এখন প্রায় বন্ধ। তাছাড়া পূর্বে যেসব প্রকল্পের কাজ চলমান ছিল এখন সেসব কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। এসময় কিছু নাগরিক ভোগান্তি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তুলছে।”
বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলের অভিমত
প্রশাসক দিয়ে নগরের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়— এমনটি উল্লেখ করে দ্রুত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান। তার মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অভাবে নাগরিক সেবা স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম অবাসযোগ্য নগরী হিসেবে আখ্যা দিয়ে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, দুর্বল সেবা ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় নগর সংকট দিন দিন জটিল হচ্ছে। নগর উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা দূর করতে সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সেবা সংস্থার মধ্যে তথ্যনির্ভর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি পরিকল্পনা ও পরিবেশসংক্রান্ত অপরাধ দমনে বিশেষায়িত আদালত গঠন করতে হবে।”
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমাদের দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো করা দরকার। সরকার সিটি করপোরেশনগুলোতে যে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে, তা নিয়েও ইতোমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়াই উচিত। আমাদের দেশে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
এদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার অবিলম্বে ছয় সিটি করপোরেশনে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের নিয়োগ বাতিল করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিদ্যমান সমস্যা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা সমাধান করা সম্ভব।” সংসদের বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও সিটি করপোরেশনের চলমান স্থবিরতা কাটাতে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন— বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
সরকারের পরিকল্পনা ও আশাবাদ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “এ বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।” এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে নাগরিক সমস্যার সমাধান দেখছেন নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞরা।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে চলমান স্থবিরতা নাগরিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। মশক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সেবামূলক কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। সরকারের পক্ষ থেকে আশাবাদী বক্তব্য থাকলেও নাগরিকরা প্রতিদিনের ভোগান্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন।



