বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে সড়কহীনতার যন্ত্রণা: শিক্ষা-চিকিৎসা থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন
বান্দরবানের পাহাড়ি গ্রামে সড়কহীনতার যন্ত্রণা

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে সড়কহীনতার যন্ত্রণা

সবুজ পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর নীলাভ আকাশের অপার সৌন্দর্যে ভরা বান্দরবান জেলা। কিন্তু এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কষ্টের এক কঠিন বাস্তবতা। রুমা উপজেলা শহর থেকে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পাইন্দু ইউনিয়নের আলেচুপাড়া গ্রাম ও এর আশপাশের চারটি পাহাড়ি পাড়ার মানুষজন সড়ক যোগাযোগের অভাবের কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন।

দুর্গম পথের কষ্টকর যাত্রা

বান্দরবান সদর থেকে রুমা যাওয়ার পথে কক্ষংঝিরি বাজারে নামতে হয়। সেখান থেকে সাঙ্গু নদী পার হয়ে পাহাড়ি কাঁচা পথ ধরে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা হাঁটতে হয় আলেচুপাড়া গ্রামে পৌঁছাতে। এই উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে কোনো পাকা রাস্তা বা যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। আলেচুপাড়া ছাড়াও তংমকপাড়া, কান্নাপাড়া, বাগানপাড়া ও থোয়াইবতং পাড়া—এই পাঁচটি গ্রামের প্রায় দেড় শ পরিবারের মানুষ একই সমস্যায় জর্জরিত।

জীবনযাত্রায় সংকট

আলেচুপাড়ার বাসিন্দা মংসাইআং মারমা (৪৯) বলেন, ‘আমাদের গ্রাম থেকে বাজারে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটতে হয়। জুমে চাষ করা ফসল বস্তায় ভরে কাঁধে করে বাজারে নিতে হয়। এটা খুব কষ্টের। অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে আরও বড় সমস্যায় পড়তে হয়।’ ৬০ বছর বয়সী জুমচাষি উমং মারমা যোগ করেন, ‘আমাদের অনেক ফসল বাজারে নামানোর আগেই পচে যায়। লাভ করার বদলে ক্ষতি হয়। আগে অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বার রাস্তা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো পাকা রাস্তা হয়নি।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবায় পিছিয়ে

গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষাসহায়ক সামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে। আর্থিক সংকট ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে অনেক তরুণ পড়ালেখা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ১৯ বছর বয়সী মংহ্লা অং মারমা বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা সড়ক নেই। এই এক সমস্যার কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রেও ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা যায়। গত ২২ জানুয়ারি আলেচুপাড়া গ্রামের সিংনু মারমা (৩০) প্রসব বেদনায় আক্রান্ত হন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় ঘরেই প্রসবের চেষ্টা করা হয়, যেখানে গর্ভের যমজ সন্তানের একজন মারা যায়। পরে তাকে স্ট্রেচারে করে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সিংনু মারমা বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকলে হয়তো আমার সন্তানকে হারাতে হতো না।’

স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি

পাইন্দু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা জানান, ‘এ সড়কটির জন্য উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা প্রশাসনে আবেদন করেছি। ওই গ্রামগুলোয় দুটি গাড়ি চলাচলের সড়ক করা হবে বলে আমাকে আশ্বস্ত করা হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি।’ গ্রামবাসীদের একটাই আবেদন—একটা রাস্তা করে তাদের জীবনটা একটু সহজ করা হোক।

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন রবিন দাশ গুপ্ত ও সাই সিং মং মারমা, যারা পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।