স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ: সংবিধান ও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত অথবা নির্বাচনে পরাজিত ব্যক্তি। দলীয় নেতাদের পুনর্বাসনের এ সিদ্ধান্ত সংবিধান ও আদালতের নির্দেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সংবিধানের বিধানাবলি
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। অনুচ্ছেদ ১১-তে বলা হয়েছে, ‘প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ অনুচ্ছেদ ৫৯-এ উল্লেখ রয়েছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অনুচ্ছেদ ৬০-এ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে কর আরোপ, বাজেট প্রস্তুত ও তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ১১ ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’–সম্পর্কিত সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এটি ‘জাস্টিসেবল’ নয়, অর্থাৎ আদালতে গিয়ে সরকারকে এ অনুচ্ছেদ কার্যকর করতে বাধ্য করা যাবে না। তবে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ সরকার মানতে বাধ্য। অর্থাৎ বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধানাবলি অনুযায়ী, জেলায় নির্বাচিত জেলা পরিষদের, উপজেলায় নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের এবং ইউনিয়নে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের শাসনকার্য পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক। একইভাবে সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভায় নির্বাচিত পৌরসভা শাসনকার্য পরিচালনা করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আদালতের ঐতিহাসিক রায়
১৯৯১ সালে উপজেলা পরিষদ বিলুপ্ত করার পর কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্পষ্ট করে দেন যে স্থানীয় সরকার আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ এবং স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব হলো স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা করা। সরকারি কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো অনির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার বিপক্ষে আদালত দৃঢ় অবস্থান নেন।
আদালত সুস্পষ্টভাবে বলেন, ‘যদি সরকারি কর্মকর্তা বা তাঁদের তল্পিবাহকদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করা হয়, তাহলে এগুলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখা যুক্তিযুক্ত হবে না।’ কারণ, গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হলো জনপ্রতিনিধিত্ব। স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি স্বাধীন ও কার্যকর সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম যৌক্তিকতা হলো যে বাংলাদেশের ‘ইউনিটারি’ বা এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের সংবিধান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
বর্তমান বাস্তবতা ও জরুরি পদক্ষেপ
বর্তমান বাস্তবতা হলো, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেরই মেয়াদ পার হয়ে গেছে, কোনো কোনোগুলোতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রশাসকও বসানো হয়েছে এবং নতুন সরকার ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তবে সাংবিধানিক ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্তৃত্বে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে কুদরত-ই-ইলাহী পনির মামলার নির্দেশনা থেকে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। ওই মামলার রায়ে আপিল বিভাগের পক্ষ থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে এই সময়সীমা সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং বর্তমান সরকার আগামী ছয় মাসের মধ্যে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিতে পারে।
আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বিদ্যমান দুটি আইন মোটামুটি ভালো অবস্থাতেই আছে এবং এগুলোর ভিত্তিতে নির্বাচনের আয়োজন অনতিবিলম্বে শুরু করা যেতে পারে। তবে গ্রামীণ সরকারব্যবস্থা তথা জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনে গুরুতর সমস্যা রয়েছে। এগুলো মান্ধাতার আমলের এবং এগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, জেলা পরিষদ আইনে অতি সীমিতসংখ্যক নির্বাচকমণ্ডলীর ভিত্তিতে ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ আদলে পরোক্ষ নির্বাচনের বিধান রয়েছে। তার বিপরীতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানরা প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।
তিনটি গ্রামীণ সরকারের আইনগুলো একত্র করে একটি সমন্বিত আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা ভারতের অনেক রাজ্যে হয়েছে। এ ধরনের একটি আইন ড. শওকত আলীর নেতৃত্বে ২০০৭ সালে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি প্রণয়ন করেছিল। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার খসড়া আইনটি অধ্যাদেশ আকারে প্রকাশ করলেও নির্বাচিত সংসদ তা অনুমোদন করেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ড. তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন স্থানীয় সরকারের আইনগুলোকে আরও পরিশীলিত করেছে। এ পরিশীলিত আইনগুলোকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দিয়ে পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।
বিএনপির ৩১ দফা অঙ্গীকার উপেক্ষা
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি তার বহু আলোচিত ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা ৩১ দফা’ও উপেক্ষা করেছে। ৩১ দফার ৯ দফায় বলা হয়েছে, ‘সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া সকল রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করিবার লক্ষ্যে এই সকল প্রতিষ্ঠানে...নিয়োগ প্রদান করা হইবে।’
দলীয়করণের বিরোধিতা ছাড়াও ৩১ দফার ২১ দফায় প্রশাসক নিয়োগের বিপক্ষে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, ‘ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিকে অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হইবে।...স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হইবে। মৃত্যুজনিত কারণ কিংবা আদালতের আদেশে পদ শূন্য না হইলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হইবে না।’ নতুন সরকারের যাত্রার শুরুতে এসব অঙ্গীকার উপেক্ষা শুভ লক্ষণের পরিচায়ক নয়, যার দ্রুত অবসান জরুরি।
পরিশেষে
বর্তমানে আরেকটি বাস্তবতা হলো যে আমাদের সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার বিধান থাকলেও বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা হয়ে পড়েছে সরকারি কর্মকর্তা বা অন্য জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রিত ও আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান। সৌভাগ্যবশত আমাদের উচ্চ আদালত ‘জেলা মন্ত্রীর’ পদ অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করছে।
পরিশেষে আমরা আশা করি যে সরকার দ্রুত আইনগুলো পরিশীলিত করে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজন করবে। একই সঙ্গে এগুলোকে স্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত করবে। পাশাপাশি বিএনপি তাদের দলের ৩১ দফার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা প্রদর্শন করবে। আরও শ্রদ্ধাশীলতা প্রদর্শন করবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি, যাতে অঙ্গীকার করা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করা হবে।’



