কক্সবাজারে সুগন্ধা সৈকতে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ: জেলা প্রশাসনের কঠোর অভিযান
কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে পুনরায় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান নির্মাণ করা হয়েছিল, যা আজ মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক নির্দেশনার পরপরই ঘটেছে, যা সৈকতের অবৈধ স্থাপনা অপসারণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে।
দখল ও উচ্ছেদের ঘটনাক্রম
আজ দুপুরে সুগন্ধা পয়েন্টের ঝাউবাগান ও বালিয়াড়ি দখল করে প্রায় ১১৩টি দোকান বসানো হয়, যেখানে কিছু সময়ের জন্য ব্যবসাও চালু ছিল। তবে মাত্র তিন ঘণ্টা পর, বেলা তিনটায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে এসব দোকান উচ্ছেদ করেন। এ সময় দখলদারদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের তর্কাতর্কি হয় এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ও পূর্ববর্তী উচ্ছেদ
এর আগে, ১২ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৯৩০টি দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল। ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদিও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দুই দশক ধরে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।
গত রোববার সকালে সুগন্ধা সৈকত পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উচ্ছেদ করা বালিয়াড়িতে আর কোনো দোকান বসাতে দেওয়া হবে না এবং সৈকত যেন আবার দখল না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।
দোকানমালিকদের বক্তব্য ও পর্যটক চাপ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দোকানমালিক জানান, ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে সৈকতে পর্যটকের ভিড় বাড়ছে এবং গত তিন দিনে কয়েক লাখ পর্যটক এসেছেন। তাঁদের চাহিদা মেটাতে দোকান বসানো হয়েছে এবং পর্যটক কমে গেলে দোকান সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
সুগন্ধা সৈকতের দোকানমালিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সুগন্ধা সৈকত থেকে উচ্ছেদের পর আমরা ৯ শতাধিক ব্যবসায়ী দিশেহারা অবস্থায় আছি। ব্যবসার জন্য দোকান বসালে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, স্থায়ীভাবে বসার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না। উচ্ছেদের সময় আমাদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।’
সুগন্ধা বিচ মার্কেট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম যোগ করেন, ‘ঈদ মৌসুমে পর্যটকের চাপ বেশি। রাস্তায় গাড়ি রাখলে মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়, তীব্র যানজট তৈরি হয়। বিকল্প জায়গা না পেয়ে সৈকত ও ঝাউবাগানে দোকান বসানো হয়েছিল। সেখান থেকেও আমাদের উচ্ছেদ করা হলো।’
জেলা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পর্যটন শাখার ইনচার্জ মনজু বিন আফনান বলেন, এই অভিযানে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং বালিয়াড়িতে আর কোনো স্থাপনা বসাতে দেওয়া হবে না। তিনি সৈকতের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর অবস্থান বজায় রাখার কথা জানান।
কক্সবাজার কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, গত দুই দশকে সুগন্ধা সৈকতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি, যা সৈকতের পরিবেশ ও সৌন্দর্য নষ্ট করছিল। সাম্প্রতিক উচ্ছেদে সৈকতের সৌন্দর্য যেমন বেড়েছে, তেমনি পর্যটকদের জন্য খোলামেলা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখন উচ্ছেদ হওয়া বালিয়াড়ি যেন আবার দখল না হয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে।
এই ঘটনা কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে অবৈধ দখলদারিত্বের চ্যালেঞ্জ এবং সরকারি পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।



