মেট্রোরেলের পিলার ও স্টেশনে পোস্টার লাগানো নিষেধ, তবুও চলছে অবাধে
মেট্রোরেলের পিলারে অবাধ পোস্টার লাগানো, সৌন্দর্যহানি

মেট্রোরেলের পিলার ও স্টেশনে পোস্টার লাগানো নিষেধ, তবুও চলছে অবাধে

মেট্রোরেল ও স্টেশন এলাকায় পোস্টার বা ব্যানার লাগানো এবং লেখা বা আঁকা নিষেধ করা হয়েছে। প্রতিটি মেট্রোরেল স্টেশনের বাইরে থাকা তথ্য সংবলিত বোর্ডে এই নিষেধাজ্ঞার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে। তবে, এই নিষেধাজ্ঞার কোনও তোয়াক্কাই করছে না কেউ। মেট্রোরেলের পিলারসহ লিফটের দেয়াল, সিঁড়ির পাশের স্টিলের ছিদ্রযুক্ত দেয়াল এবং নিচে থাকা বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনের দেয়াল কোথাও যেনো আর খালি নেই পোস্টার লাগানো থেকে।

পোস্টারের বিস্তার ও সৌন্দর্যহানি

রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন ধরনের পোস্টার থেকে শুরু করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, হারানো বিজ্ঞপ্তি, বাসা ভাড়া, অফিস ভাড়া, কোচিং সেন্টার, শোক বার্তা, ঈদের শুভেচ্ছা, ওরস শরীরের দাওয়াত, সমাবেশের ডাক, বিচার চাওয়া, পাত্র-পাত্রী চাওয়া, সুন্নতে খৎনা করানোর বিজ্ঞাপন, সিনেমার পোস্টার এবং নানা ধরনের বিজ্ঞাপনী পোস্টারসহ এহেন কোনও পোস্টার বাকি নেই যা লাগানো হয়নি মেট্রোরেলের পিলারসহ বিভিন্ন দেয়ালে। এর ফলে নগরীসহ মেট্রোরেলের পিলারগুলোর সৌন্দর্য যেমন মারাত্মকভাবে হারিয়েছে, তেমনি রাজধানীজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে নোংরা কিছু স্তম্ভ যা দৃষ্টিকটু হয়ে উঠেছে।

কেবল পোস্টার, স্টিকার কিংবা ব্যানারই নয়, মেট্রোরেলের স্টেশনগুলো ঘিরে ভাসমান দোকানগুলোও সৌন্দর্য নষ্ট করছে এবং যাত্রীদের চলাচলের বাধা সৃষ্টি করছে। প্রতিনিয়ত মেট্রোরেলের পিলারগুলোতে পোস্টারের পরত বাড়তে থাকলেও ভ্রুক্ষেপ নেই কর্তৃপক্ষের। নগরীর সৌন্দর্য কিংবা নাগরিকদের চোখের প্রশান্তি কেবলই ঐচ্ছিক বিষয় বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ চলছে দায় এড়িয়েই, যা যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরেজমিনে পরিদর্শন ও যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া

সরেজমিনে মেট্রোরেলের আটটি স্টেশন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মেট্রোরেলের পিলারের ওপরে জমেছে মোটা পোস্টারের আবরণ। যেগুলো তোলার কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কেবল পিলারই না, স্টেশনে উঠার সিঁড়ির পাশ দিয়ে স্টিলের যে ছিদ্রযুক্ত বেড়া বা দেয়াল রয়েছে সেখানেও জমেছে পোস্টারের আবরণ। একই চিত্র দেখা যায়, লিফটের শ্যাফট বা দেয়াল এবং ট্রেন চলাচলের পথের নিচে থাকা বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনের দেয়ালে।

মেট্রোরেলে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী নাঈম হোসেন বলেন, “মেট্রোরেলের পিলারে বা অন্যান্য দেয়ালগুলোতে আগেও পোস্টার ছিলো, তবে অনেক কম। হাতেগোনা কয়েক জায়গায়। কিন্তু, এখন এটা কোথাও বাকি নেই। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পরে এটাকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। দিনদিন অপরিচ্ছন্ন হচ্ছে।”

আরেক যাত্রী মাহফুজুর রহমান বলেন, “দেশের প্রথম মেট্রোরেল নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে গর্বিত বলতে পারি। এটার মতো সার্ভিস অন্য বাহনে পাই না। কিন্তু, এখন স্টেশনের বাইরের যে চিত্র সেটা খুবই নোংরা। পিলারগুলোতে যে হারে পোস্টার লাগানো হয়েছে সেগুলো সত্যিই খুব দৃষ্টিকটু। আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বেশকিছু পিলারে বিভিন্ন থিমে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিলো, সেগুলো দেখতে খারাপ লাগেনি। কিন্তু, এগুলোর ওপরেও পোস্টার লাগানো হয়েছে। আমার মনে হয়, কর্তৃপক্ষের এদিকে নজর দেওয়া উচিত, ভালোভাবে মনিটরিং করা উচিত। যারা এসব পোস্টার লাগায় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

মাঈশা হক নিয়মিত যাতায়াত করেন মেট্রোরেলে। তিনি বলেন, “মেট্রো স্টেশনের আশেপাশের পরিবেশও নোংরা-ময়লা হয়ে থাকে ছোট ছোট দোকানের জন্য। চায়ের দোকান বা চটপটির দোকান থাকে যেখান থেকে সবসময়ই ময়লা হতে থাকে। এছাড়াও ছোট ছোট অনেক দোকান থাকায় স্টেশনের সিঁড়িতে যেতেই কষ্ট হয়ে যায়। কারণ, সেখানে শুধু দোকানতো না দোকানের কাস্টমাররাও থাকে।”

কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানো ও আইনি দিক

জনপ্রিয় বাহন মেট্রোরেল নিয়ে এসব অনিয়ম এবং সৌন্দর্যহানী ক্রমাগত ঘটতে থাকলেও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই কর্তৃপক্ষের। তারা এসবের দায়-দায়িত্ব একজনের দিক থেকে অন্যজনের দিকেই ঠেলে পাঠাচ্ছেন। মেট্রোরেলের পিলার, স্টেশন বা দেয়ালে পোস্টার লাগানো, রং করা বা লেখা-আঁকাআঁকি করা নিষিদ্ধ। কিন্তু, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সব জায়গা পোস্টারে ভরে গেছে। ফলে পরিবেশ অপরিষ্কার ও দৃষ্টিকটু হয়ে উঠছে।

এ বিষয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ কী ভাবছে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) পরিচালক (প্রশাসন) এ. কে. এম. খায়রুল আলম বলেন, “এটা তো আমি বলতে পারবো না। এটাতো আমাদের অপারেশন সাইট থেকে দেখে। আপনি ডিরেক্টর অপারেশনের সঙ্গে কথা বলেন। তারা কী চিন্তা করছেন, সেটা বলতে পারবেন।”

পরবর্তীতে একই বিষয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) পরিচালক (অপারেশন এন্ড মেইন্টেন্যান্স) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “এগুলো আমি বলতে পারবো না। এগুলো আমাদের অ্যাডমিন ডিপার্টমেন্টের বিষয়। এটা অপারেশনের পার্ট না। এটা অ্যাডমিনের পার্ট।”

দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, উদ্দেশে পূরণকল্পে, কোনও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাইবার জন্য প্রশাসনিক আদেশ দ্বারা স্থান নির্ধারণ করিয়া দিতে পারিবে এবং উক্তরূপে নির্ধারিত স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে। তবে শর্ত থাকে যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, উল্লিখিত নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনও স্থানে বিধি দ্বারা নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে, দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে।

নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনও স্থানে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে না। কোনও ব্যক্তি বিধান লঙ্ঘন করিলে উহা এ আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে। সেক্ষেত্রে অপরাধের জন্য উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড এবং বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদানের কথাও উল্লেখ রয়েছে দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইনে।