বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে নিজেদের টাকায় রাস্তা বানালো চার পাড়ার মানুষ
বান্দরবানের রুমা উপজেলার রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছায়নি। রুমা বাজার থেকে জীপগাড়িতে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে এসব জনপদে পৌঁছাতে হয়। রুমা বাজার থেকে পলি প্রাংসা পাড়া পর্যন্ত সরকারি রাস্তা থাকলেও এর পরবর্তী পথ সম্পূর্ণ অবহেলার শিকার।
নিজেদের উদ্যোগে রাস্তা নির্মাণ
পলি প্রাংসা পাড়া থেকে আরও প্রায় দুই ঘণ্টার দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পকহাই পুরান পাড়া, পোহাই নতুন পাড়া, জিসুরাম পাড়া ও তমক পাড়াসহ চারটি পাড়ার মানুষেরা নিজেদের উদ্যোগে একটি রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এর জন্য তারা যৌথভাবে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। প্রতি পরিবার থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা করে সংগ্রহ করা হয়, যা বছরের পর বছর জুম চাষের ফসল বিক্রির অর্থ থেকে জমিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মারাত্মক প্রভাব
এলাকাবাসীর অভিযোগ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত, শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে এবং কৃষিপণ্য ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না। জিসুরাম ত্রিপুরা বলেন, "প্রতি মণ কৃষিপণ্য পলি প্রাংসা পর্যন্ত মাথায় বহন করতে প্রায় ৬ শত টাকা খরচ হয়। তাই আমাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোও এই রাস্তায় ব্যয় করতে হয়েছে।"
সরকারি সহায়তার দাবি
পকহাই পাড়ার কারবারি পকসিং ম্রো বলেন, "সরকার যদি এই রাস্তায় সহায়তা দিত, তাহলে চারটি পাড়ার মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যেত। আমাদের সন্তানের খাবার ও কাপড়ের টাকা পর্যন্ত এই রাস্তায় ব্যয় করেছি—এখন আমাদের স্বপ্ন সরকারের সহায়তা পাওয়া।"
উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক অংথোয়াইচিং মারমা বলেন, "দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও বর্তমান সরকার আমাদের রুমা সদর ইউনিয়নের উন্নয়নে ন্যূনতম ছোঁয়াও দিতে পারেনি। বছরের পর বছর অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার এই জনপদ। বাধ্য হয়ে পাড়াবাসী নিজেদের উদ্যোগে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন সড়ক নির্মাণ করেছে।"
মানুষের সংগ্রামের প্রতীক
২৩ মার্চ সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, চার পাড়ার মানুষ নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ও পরিশ্রম দিয়ে যে রাস্তা নির্মাণ করেছেন, তা তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্র কোথায়?
উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি উচহ্লা মারমা বলেন, "বর্তমান সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ—এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দিকে জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দেওয়া হোক। যথাযথ পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে রাস্তাটি নির্মাণ বা সংস্কার করা হলে শত শত পরিবার দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে।"
মৌলিক অধিকারের দাবি
এলাকাবাসীরা আরও বলেন, এটি শুধু একটি রাস্তার দাবি নয়, এটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান। সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই জনপদের মানুষের দুর্ভোগ কোনোদিনই কমবে না। এই রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে তারা দেখিয়েছেন যে, স্থানীয় সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা কীভাবে উন্নয়নের একটি মৌলিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
এই উদ্যোগটি শুধু একটি রাস্তা নয়—এটি মানুষের বঞ্চনা, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের জীবন্ত সাক্ষ্য। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।



