ঢাকার খাল উদ্ধারে বিশাল ব্যয়, তবুও হতাশাজনক ফলাফল
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সারা দেশে ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে ঢাকার খালগুলো উদ্ধার ও খনন অনেক বেশি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসকেরা খালগুলো পুনরুদ্ধারের আশ্বাস দিলেও গত কয়েক বছরের ব্যয় ও ফলাফলের হতাশাজনক চিত্র আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে।
২৬৩ কোটি টাকা ব্যয়, তবুও খাল ময়লার ভাগাড়
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) খাল সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করেছে প্রায় ১৯৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গত চার বছরে ব্যয় করেছে ৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই সিটি মিলিয়ে প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা খালের পেছনে খরচ হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে খালের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উত্তর সিটির ৩২টি খালের মধ্যে অর্ধেকের বেশি এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। রূপনগর বা রামচন্দ্রপুর খালের কোনো কোনো অংশ বর্জ্যের স্তূপে এমনভাবে ভরাট হয়ে গেছে যে সেখানে পানির প্রবাহ খুঁজে পাওয়া দায়।
দখল ও দূষণের মহোৎসব অব্যাহত
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো দখলের ধরন। উত্তর সিটির বাউনিয়া খালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের উপস্থিতিতে ঘটা করে সংস্কারকাজ উদ্বোধনের পরও সেখানে এখন বাঁশের খুঁটি পুঁতে খাল ভরাটের মহোৎসব চলছে। দক্ষিণ সিটির চিত্র আরও হতাশাজনক। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল খনন করার মাত্র দুই বছরের মাথায় সেখানে এখন মাটি ভরাট করে ইট-বালুর ব্যবসা চলছে। খিলগাঁওয়ের জিরানি খাল বা হাজারীবাগের কালুনগর খালের অনেক অংশ এখন আবর্জনার স্তূপে মৃতপ্রায়।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় খাল দখলমুক্ত করা জরুরি
আসন্ন বৃষ্টির মৌসুমকে ঘিরে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়েও গবেষকেরা সতর্কতা দিয়েছেন। ডেঙ্গু মোকাবিলায় খালগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রতিবছর কেবল ‘রুটিন কাজ’ বা দায়সারা পলি অপসারণ কোনো সমাধান নয়। খাল দখল ও দূষণের পেছনে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি কাজ করে, তাদের চিহ্নিত করে উচ্ছেদ করা না গেলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হবে না।
বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ও কঠোর আইন প্রয়োগের আহ্বান
খালের প্রাকৃতিক প্রস্থ ও গভীরতা ফিরিয়ে আনা এবং সেগুলোকে বুড়িগঙ্গা বা বালু নদের মতো বড় জলাধারের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা জরুরি। কেবল ড্রেনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থাকে সচল করতে হবে। নতুন প্রশাসকদের প্রতিশ্রুতি কেবল ‘সরেজমিন পরিদর্শন’ বা ‘অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা’র অতিকথনের মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না। ২৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন খালগুলো আজ ভাগাড়, তার একটি স্বচ্ছ নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন।
জনগণের করের টাকা খালের কর্দমাক্ত পানিতে ভেসে যাবে—এটি মেনে নেওয়া যায় না। ঢাকার খালগুলো উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণে যদি বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা না নেওয়া হয়, তাহলে রাজধানীবাসীকে এক দুঃসহ জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা ভোগ করে যেতেই হবে। কেবল ঘোষণায় নয়, খাল রক্ষায় প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ ও নিরবচ্ছিন্ন তদারকি। প্রতিটি সরকারের আমলে রাজধানীর খাল পুনরুদ্ধার নিয়ে নানা প্রকল্প নিয়েছে, সেগুলোর খুব একটা সুফল পাওয়া যায়নি। নতুন সরকারকে অবশ্যই পুরোনো প্রকল্পগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছে সেটা পর্যালোচনা করেই নতুন প্রকল্প নিতে হবে। রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো উদ্ধার, খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের বিকল্প নাই। খাল খননে ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি চায় না।



