জামায়াত ও এনসিপির অভিযোগ: বিএনপির দলীয় প্রশাসক নিয়োগে স্থানীয় নির্বাচন বিলম্বের ষড়যন্ত্র
জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে বিএনপির দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। দল দুটি মনে করে, এই পদক্ষেপ ভোট ছাড়াই স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি কৌশল। তারা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জোর দাবি জানিয়েছে।
পটভূমি: ২০২৪ সালের পরিস্থিতি ও শূন্য পদ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরের জনপ্রতিনিধিরা পালিয়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। এতে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের পদগুলো শূন্য হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে অন্তত দেড় হাজারে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়, কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন, বাকি প্রায় তিন হাজার ইউনিয়নে আগের চেয়ারম্যানরা দায়িত্বে ছিলেন।
নির্বাচন পরবর্তী অবস্থা ও বিএনপির বিজয়
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় পায়। নির্বাচন শেষে ধারণা করা হচ্ছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। ১ মার্চ নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেছিলেন, ঈদের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
দলীয় প্রশাসক নিয়োগের ধারাবাহিকতা
এরই মধ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে ছয়জন পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৪ মার্চ আরও পাঁচটি সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার, যারা সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গত রোববার ৪২টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী অন্তত আটজন রয়েছেন এবং অন্যরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
জামায়াত ও এনসিপির প্রতিক্রিয়া
জামায়াত মনে করে, দলীয় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে জামায়াত পৃথক বিবৃতি দিয়েছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সরকারের এমন পদক্ষেপ স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং একই সঙ্গে আরেকটি পাতানো নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ।”
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ফেসবুকে একটি পোস্টে উল্লেখ করেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে সামনে না এনে, আগে প্রশাসনিক কাঠামো দখলে নেওয়ার এই প্রবণতা কেবল অস্থায়ী ব্যবস্থা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না।”
সংবিধান ও প্রশাসনিক দলীয়করণের আশঙ্কা
জামায়াত নেতারা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবেন, কিন্তু প্রশাসকরা নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দিলে পুরো প্রশাসন দলীয়করণ হবে। সর্বত্র দলীয়করণ হলে বিভিন্ন বরাদ্দও দলকেন্দ্রিক হয়ে যাবে, সাধারণ মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী পাবে না। এটা অতীতের সংস্কৃতি, এখনো চলছে।”
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন মনে করেন, নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলেও বিএনপি স্থানীয় সরকার কাঠামোকে দলীয়ভাবে দখলের চেষ্টা করছে, যা সামনের দিনে নির্বাচনে প্রভাব তৈরি করে গোটা দেশকে একদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ও আন্দোলনের সম্ভাবনা
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, ২৮ মার্চ ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের একটি বৈঠক হতে পারে, যেখানে আগামী দিনের আন্দোলনের রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনে মাঠের কর্মসূচিও ঘোষণা হতে পারে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে জামায়াত আরও শক্ত অবস্থানে যাবে।”
