ঢাকা মেট্রোরেলে 'লুপ রাইডিং' বন্ধে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ
ঢাকা মেট্রোরেলে কিছু যাত্রীর বিরুদ্ধে 'সিস্টেমের ফাঁক' গলিয়ে এক বা দুই স্টেশন আগে উঠে আসন দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ যাত্রীদের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ আসার পর কর্তৃপক্ষ মতিঝিল টার্মিনাল স্টেশনে নিয়মিত অপারেশন বা ট্রেন চালানোর নিয়মে কিছু বদল এনেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ ও নাগরিক বোধের প্রশ্ন
উত্তরাগামী অনেক যাত্রীর অভিযোগ, এক শ্রেণির যাত্রী উত্তরা থেকে আসার সময় মতিঝিলগামী ট্রেনে উঠে পড়েন। তারা মতিঝিল স্টেশনে নামার বদলে সিটে বসেই থাকেন এবং একই ট্রেনে আবার উত্তরার দিকে যাত্রা শুরু করেন। এর ফলে সচিবালয় বা শাহবাগের মতো মাঝখানের স্টেশনগুলো থেকে যারা ওঠেন, তারা ব্যস্ত সময়ে কোনও আসন খালি পান না।
বেসরকারি চাকুরিজীবী তানভীর হোসেন বলেন, "আমি প্রতিদিন সকালে সচিবালয় থেকে উঠি। কিন্তু ট্রেন আসার আগেই দেখি সব সিট দখল হয়ে আছে। পরে জানলাম, কিছু মানুষ আসন নিশ্চিত করতে আগে মতিঝিল যান এবং একই ট্রেনে বসে থেকে আবার ফিরে আসেন।"
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বিষয়টিকে নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, "মেট্রোর ভাড়া নির্ধারিত হয় দূরত্বের ওপর, আপনি কতক্ষণ এসি কোচের ভেতর বসে থাকলেন তার ওপর নয়। এভাবে সিট দখল করা অন্যদের প্রতি অন্যায়।"
কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও নতুন নিয়ম
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকা মেট্রোরেলের অপারেশন প্রধান মো. নজরুল ইসলাম জানান, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং মতিঝিল স্টেশনে ট্রেন ঘোরানোর (টার্নঅ্যারাউন্ড) পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "আগে একটি ট্রেন মতিঝিল আসার পর প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তন করে আবার ছেড়ে যেতো। এখন ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোয় যাত্রীরা সরাসরি মতিঝিল থেকেই নতুন ট্রেনে উঠতে পারবেন। এছাড়া কোনও যাত্রী মতিঝিল পৌঁছানোর পর ওই একই ট্রেনে বসে থেকে ফিরতি যাত্রা করতে পারবেন না। তাকে অবশ্যই ট্রেন থেকে নামতে হবে এবং অন্য প্ল্যাটফর্মে গিয়ে নতুন ট্রেনে উঠতে হবে।"
প্লাটফর্ম বা ট্রেনের ভেতর অহেতুক ঘোরাঘুরি বন্ধ করতে চেক-ইন এবং চেক-আউটের মধ্যবর্তী সময়সীমা কমিয়ে এনেছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। নজরুল ইসলাম বলেন, "আমরা অনুমোদিত সময় কমিয়ে দিয়েছি। যদি কোনও যাত্রী নির্ধারিত সময়ের বেশি প্ল্যাটফর্ম বা সিস্টেমের ভেতরে অবস্থান করেন, তবে তাকে জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।"
শিষ্টাচার ও গণপরিবহন সংস্কৃতি
এই সমস্যাটি যাত্রীদের মধ্যে শিষ্টাচার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিছু যাত্রী যুক্তি দিচ্ছেন যে, তারা ভাড়া পরিশোধ করে সময়ের ভেতরে থাকলে কোনও নিয়ম ভাঙছেন না। তবে ব্যাংক কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলামের মতে, "গণপরিবহন শুধু নিয়মে চলে না, নাগরিক বোধ থেকেও চলে। সবাই যদি সিট দখলের জন্য এভাবে উল্টো পথে ঘুরে আসা শুরু করে, তবে সাধারণ যাত্রীদের জন্য যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়বে।"
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বড় শহরগুলোর গণপরিবহনে এমন প্রবণতা দেখা যায়, যা টার্মিনাল স্টেশনে কড়া নজরদারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। উদ্বোধনের পর থেকে মেট্রোরেল ঢাকার যানজট কমিয়ে হাজারো মানুষের সময় বাঁচালেও, যাত্রী সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে শৃঙ্খলা রক্ষা করা কর্তৃপক্ষের জন্য এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
