বরিশালে কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে নাগরিক সেবা বিপর্যয়, মশার দাপটে অতিষ্ঠ নগরবাসী
বরিশালে কাউন্সিলর অনুপস্থিতিতে সেবা বিপর্যয়, মশার দাপট

বরিশালে কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে নাগরিক সেবা বিপর্যয়

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও অধিকাংশ কাউন্সিলর আত্মগোপনে চলে যান। এরপর গত ১৯ আগস্ট বিভাগীয় কমিশনার মো. শওকত আলী সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ৩০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৪ জন কাউন্সিলর আত্মগোপনে এবং একজন আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ায় নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সেবা থেকে বঞ্চিত নগরবাসী

সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ, মৃত্যুসনদ, নাগরিকত্ব সনদ, চারিত্রিক সনদ, উত্তরাধিকার সনদ, ভূমিহীন সনদ, টিসিবি কার্ড, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদসহ বিভিন্ন সনদ প্রদান করা হয়। এছাড়া, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় যাচাইকারী হিসেবে স্বাক্ষর দিতে হয় কাউন্সিলরকে। মামলা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে কাউন্সিলররা অনুপস্থিত থাকায় এসব সেবা অচল হয়ে পড়েছে।

সেবাগ্রহীতারা জানান, একজন মেয়র ও ৩০ কাউন্সিলরের স্থলে ২০ জন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দাফতরিক কাজের চাপে তারা নাগরিকদের সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। জন্মনিবন্ধন সনদ পেতে আগে এক সপ্তাহ সময় লাগলেও এখন এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে প্রশাসকের কক্ষে প্রবেশই করতে পারছেন না, ফলে নাগরিক সেবা সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে।

আত্মগোপনের কারণ ও মামলা

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট থেকে নগরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলররা আত্মগোপনে চলে যান। কয়েকজন কাউন্সিলরের কার্যালয় বিক্ষুব্ধ লোকজন পুড়িয়ে দেন এবং একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর আগুনে পুড়ে মারা যান। বিএনপির দায়ের করা পৃথক তিনটি মামলায় অন্তত ১৭ জন কাউন্সিলর আসামি হয়েছেন। গত ২৩ আগস্ট বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান বাদী হয়ে ৩৮১ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন, যাতে ১৩ জন কাউন্সিলরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এতে কাউন্সিলররা পুনরায় গা ঢাকা দেন।

প্রশাসকদের সীমাবদ্ধতা

সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ হুমায়ুন কবির লিংকু, ফিরোজ আহমেদ ও হুমায়ুন কবির জানান, প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের নিজস্ব অফিসের কাজের পাশাপাশি নগরবাসীকে সেবা দিতে হচ্ছে। কিন্তু নগরবাসী কর্মকর্তাদের অফিস কক্ষে প্রবেশ করতে পারছেন না, কারণ তাদের প্রটোকল রয়েছে। জরুরি সেবা, নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ এবং রাতে বাতি না জ্বলাসহ নানা কার্যক্রম অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মর্তুজা আবেদীন বলেন, 'প্রশাসকদের কাছ থেকে নগরবাসী সেবা পাচ্ছেন না। একটি নাগরিক সনদ পেতে দেড় মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করার নজির আছে।' সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম দ্রুত নির্বাচন অথবা আগের কাউন্সিলরদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের পরামর্শ দেন।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী স্বীকার করেন, 'বর্তমানে যারা কাউন্সিলরদের স্থলে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের পক্ষে নাগরিকদের শতভাগ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে তারাও চেষ্টা করছেন সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার।' মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম চলমান থাকলেও বহুতল ভবনের প্ল্যান পাসের বিষয়ে আইন মেনে চলতে কনস্ট্রাকশন ফার্মগুলো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

মশার দাপটে অতিষ্ঠ নগরবাসী

শুষ্ক মৌসুমে মশার অস্বাভাবিক বিস্তারে বরিশাল নগর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় মশা নিধনে সিটি করপোরেশন গত রবিবার থেকে 'ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' শুরু করেছে। পরিচ্ছন্নতা বিভাগ ১২টি জরুরি দল গঠন করে নগরজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. মনজুরুল হক জানান, মশার বিস্তার রোধে ৫২ সদস্যের দল কাজ করছে এবং নতুন ভ্যারাইটির ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস বলেন, প্রতিদিন ২০০ লিটার অ্যাডাল্টিসাইড এবং ২০ লিটার লার্ভিসাইড ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে চারপাশে মশা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ থাকায় স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে পড়ছে।

নগরবাসীরা অভিযোগ করেন, মশক নিধনকর্মীরা ফগার মেশিন হাতে ওষুধ ছিটালেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রাকৃতিক কারণে নদী, খাল ও বিলের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা নগরবাসীকে মারাত্মক ভোগান্তিতে ফেলেছে।