শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে খনন করা চৌক্কার খাল এখন বিলীন হওয়ার পথে
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ছাপিলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত চৌক্কার খাল, যা স্থানীয়ভাবে গড়গড়িয়া খাল নামে পরিচিত, বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে বিলীন হওয়ার পথে। প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি লবলং খালের একটি শাখা হিসেবে দোখলা বাজার থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্ব দিকে ছাপিলাপাড়া ও ভাংনাহাটি গ্রাম হয়ে কৃষিজমিতে মিলিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বর্তমান সংকট
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৮ সালের দিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরাসরি এলাকায় এসে এই খাল খননের কাজে অংশ নেন। তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন, যা এলাকাবাসীর মনে এখনো অম্লান স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে। তবে বর্তমানে খালটি ভরাট, দখল ও দূষণের শিকার হয়ে তার গুরুত্ব হারাচ্ছে।
তৎকালীন শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল হেলিম স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেব গাড়ির বহর নিয়ে ছাপিলাপাড়া অংশে আসেন। তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন, যা দেখে শ্রমিকেরা বিস্মিত হন।' তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি কারখানা নির্মাণের সময় খালের প্রায় ৫০০ গজ অংশ ভরাট করা হয়েছে, যার ফলে কৃষকরা ধান চাষে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
দূষণ ও পরিবেশগত প্রভাব
আবদুল হেলিমের মতে, আশপাশের অন্তত ২০টি কারখানার বর্জ্য সরাসরি খালে পড়ছে, যা পানি দূষিত করে কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষতি করছে। খালটি ভরাট হওয়ায় বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ে আশপাশের বাড়িঘর প্লাবিত হয়। পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, 'শ্রীপুরের খালগুলো কারখানা ও নাগরিক বর্জ্যের আধারে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের মূল্য দিচ্ছে কৃষক ও সাধারণ মানুষ।'
পুনঃখননের দাবি ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মাসুদ ইবনে মোবারক ও খালপাড়ের বাসিন্দা শামিম আহমেদের মতো অনেকেই জিয়াউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে খাল পুনঃখনন জরুরি বলে মনে করেন। গাজীপুর-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, 'অবশ্যই আমি এই খালটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খননের জন্য যা যা দরকার সব করব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব। মানুষের প্রত্যাশার পাশাপাশি এটা আমার নিজেরও দায়িত্ব, কারণ এখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।'
তৎকালীন শ্রীপুর উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সরকার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ভূমিদস্যুরা খাল দখল করেছে এবং অনেক জায়গায় পাড় কেটে ফেলা হয়েছে। তিনি খনন জরুরি বলে মত দেন এবং কারখানাগুলোকে ইটিপি ব্যবহার করতে বাধ্য করার ওপর জোর দেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
স্থানীয়দের মতে, চৌক্কার খাল শুধু একটি জলাধার নয়, এটি কৃষি, পরিবেশ ও ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ। যথাযথ পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ ও বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হলে খালটি আবারও সেচ, মাছ চাষ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই খালের সংরক্ষণ শুধু পরিবেশগত সুবিধাই নয়, জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রক্ষারও দাবিদার।
